fbpx

একগুচ্ছ কবিতা: মুমতা হেনা

বিধ্বংসী আমি

কন্ঠে সুরে এসেছিল,
ওরা শ্বাসনালী চেপে ধরে
কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিলো।

শত বছর পর
পদযুগলে শক্তি পেয়েছিলাম
ওরা পায়ে শিকল পরিয়ে দিলো

অনেক আশা নিয়ে অরণ্যের সবুজ দেখবো বলে চোখ মেলেছিলাম,
কিন্তু সে চোখ অন্ধ করে দিলো।

আমি বিধ্বংসী হব, শিকল ভাঙ্গবো,
যাবো সবুজারণ্যের গভীর থেকে গভীরে..
পাইন সারির ফাঁকে সূর্যের আলো আসবে
আর আমি কন্ঠের জড়তা ভেঙে চিৎকার করে বলবো-“আমি পেরেছি।”

 

দুঃখ

কবির অনিকেত প্রান্তর জুড়ে হতাশা
যুগ-যুগান্তের প্রেম আজ ভঙ্গুর,
বুভূক্ষ হৃদয়ে তীব্র আর্তনাদ
কামনাহীন নিষ্প্রান হতাশা।
সোনালী প্রহর ধূসর আজ
মিলনের গীতি কাব্যেই শোক গাঁথা
হৃদয় কল্লোল সৃষ্ট হিরণ্ময় কাব্য
আজ কেবলই দুঃখ কথা।

 

ব্যর্থ গোধূলি

গোধূলির শেষ শেষ।
সন্ধ্যাকে ছোঁয়ার অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে
ব্যর্থ গোধূলি আজ ও হার মানলো!
যে ডানায় এক পৃথিবী স্বপ্ন মেখে
মেঘে ঘর বাঁধবার আশা নিয়ে
পাখিগুলো আকাশে উড়েছিল!
সে ডানায় একরাশ ক্লান্তি মেখে,
সূর্যের উত্তাপে চোখ ঝলসে
পরাজিত পাখি ফিরছে নীড়ে
তৃষ্ণার্ত আমি অপেক্ষায়…
না না! মিছে কথা!
কখনো কি কেউ ছিলো আমার
ফিরে আসার ঘরে?
হয়তো আছে কেউ! কিন্তু
সম্পর্কটা গোধূলি আর সন্ধ্যার মতো
খুব কাছে দেখালেও
আসলে লক্ষ যোজন দূরে!

সূর্য-লতিকা

সবুজ ছোট্ট লতিকাটি, এক প্রভাতে
ভালোবেসেছিল ঐ সুর্যটাকে
সূর্যকে স্পর্শ করার অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে উঠছিলো বেড়ে।
বাড়তেই থাকলো।
তবে সূর্যকে ছুঁতেই পারছিল না!
কিন্তু লতিকাটি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল।
তাই লতিকার শীর্ষ বৃত্তের মত গোলাকার হয়ে মুড়ে গেলো।
সে বৃত্তের রোজ একবার ক্ষণিকের জন্য সূর্য বাঁধা পড়তো।
মাঝে ছিল লক্ষ যোজন তফাৎ!
হঠাৎ লতিকার অভিমান হল ভীষণ!
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল,
সুযোগ ভিক্ষা চাইলো
সূর্যের সাথে একটিবার কথা বলার!
অবশেষে এক মহেন্দ্র ক্ষণে তার প্রতীক্ষার অবসান ঘটালো!
সূর্য-লতিকার কথোপকথন-
লতিকা বললো, জানো আমি তোমায় কত্ত ভালবাসি!
বড় সাধ জাগে তোমার একান্ত করে পাবার!
কিন্তু প্রিয়, কেন পাই না তোমায়?
সূর্য নিস্তব্ধতা ভেঙে উত্তর দিলো-
আমিও তোমায় বড্ড ভালোবাসি!
লতিকা বললো-
আমি নিতান্তই ক্ষুদ্র তোমার কাছে।
তাই বুঝি ধরা দাও না তুমি আমার কাছে?
সূর্য সহাস্যে জবাব দিলো,
জানো প্রিয়,
ক্ষুদ্র-বৃহৎ, কাছে-দূরে এসব ভালোবাসা পরিমাপের নিয়ামক নয়!
প্রতিরাতে তোমারই মতো উৎকন্ঠা নিয়ে আমিও অপেক্ষায় থাকি কখন ভোর হবে!
প্রতি ভোরে মিষ্টি আভায় তোমায় দেখি!
শিশির সিক্ত কম্পমান তোমায় উষ্ণতার পরশ বুলাই,
সকাল থেকে সন্ধ্যা
তোমায় ভালোবাসা পাঠাই,
আর সেই ভালোবাসায় বাঁচো তুমি!

অস্তিত্ব

পুরান ঢাকার সংকীর্ণ অলিগলি,
ছাপাখানার খটর-খটর শব্দ
বাংলাবাজারের নতুন বইয়ের ঘ্রাণ,
বিউটি বোর্ডিংয়ের স্যাঁতস্যাঁতে মাটির গন্ধ,
ভিক্টোরিয়ার কোরাস গান!
শাঁখারিবাজারের ধুপ-চন্দনের গন্ধ আর তীব্র কোলাহল;
ইসলামপুরের কাপড়ের গন্ধ
সদরঘাট লঞ্চের সাইরেন
ফরাসগঞ্জ ব্রিজের শেষ বিকেলে বাতাস,
পুরাতন শ্যাওলা বিদীর্ণ হর্ম্য দেয়ালের সোঁদা গন্ধ,
বুড়িগঙ্গার শান্ত জলে নৌকায় শুয়ে দেখা শরৎ এর আকাশ,
বৈঠার তাল, জল ছল-ছল
বেবী সাহেবের ডকে আলকাতরার তীব্র গন্ধ,
কখনো পাতলাখানের জর্দার গন্ধ;
কাজল ব্রাদার্স এর সামনের দৌড়ে ছুটে চলা,
লক্ষ্মীবাজারে রাস্তাগুলোয় কত সুখ-দুঃখের গল্প বলা!
মসজিদের আজান,
মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি
মিলেমিশে একাকার!
এ স্থান আমার স্মৃতি গন্ধে ভরপুর!
জীবনের প্রয়োজনে যাই না যতই দূরে
স্মৃতির তাগিদে আসবো ফিরে ফিরে!

 

নীলাম্বর

আকাশ হবি?
নীল আকাশ,
শান্ত নীল!

সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে উড়ে যাবে দূরে
তুই তো আকাশ!
পারবেনা তোকে ছুঁতে!
বড্ড ক্লান্ত মেঘ!
অবশেষে জল হয়ে ঝরে পড়বে!
সে জলে সিক্ত হবো আমি!
আমার ও শখ জাগবে!
মেঘের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করার শখ!
আমি ও ছুঁতে চাইবো তোকে!
খুব করে চাইবো।
আমিও ক্লান্ত হবো!
সূর্য যখন অস্তাচলে যাবে,
ক্লান্ত আমি ঝাঁপ দিবো স্নিগ্ধ জলে,
হঠাৎ সে জলে শুরু হবে জলোচ্ছ্বাস!
বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড কম্পিত হবে,
সে কম্পনে সৃষ্টি হবে
এমন আরো একটি কবিতা!
সে কবিতায় আমিও আকাশ হবো!

 

আরো পড়ুন: গল্প লেখার কলাকৌশল

আমাদের ইউটিউব: সুধাপাঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!