fbpx

গল্প রচনাকৌশল: হাসান রাউফুন

গল্প শুনতে, বলতে আর লিখতে কে না ভালোবাসে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই সারা জীবন গল্পের মায়াজালে আবদ্ধ থাকে। যুগে যুগে গল্প বলা হয়েছে, গল্প লিখা হয়েছে। তবে গল্প বলা আর লেখার ভঙ্গি এক রকম নয়। রূপকথার গল্প শুনে শুনে বড় হয়নি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। আধুনিক যুগেও রূপকথার সঙ্গে এসে যুক্ত হলো ছোটগল্প, খুদেগল্প, অণুগল্প। গল্প অর্থ কাহিনি। ক্ষুদ্র বর্ণনাপ্রধান চমকপ্রদ কাহিনি। মানব জীবনের বিচিত্র, জটিল, সূক্ষ্ম ও বহুবিলাস- বহুমুখী বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে গল্পে। উপন্যাসের কাহিনির মতো এত বড় কাহিনি গল্পে থাকে না। আবার গল্প কখনোই কাহিনির ভেতরে ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বল হয় না যেমনটা বলা হয় উপন্যাসের ক্ষেত্রে। গল্প যখন ছোট হয় তখন ছোটগল্প,  গল্প যখন আরো ছোট হয় কথন খুদেগল্প, গল্প যখন রূপক বা প্রতীকী হয় তখন অণুগল্প হয়। তবে গল্প যেকোনো আকার ধারণ করুক না কেন গল্পের বৈশিষ্ট্য ও উপাদান অক্ষুণœ থাকবেই থাকবে।

গল্প রচনা একটি সৃজনশীল কাজ। ৫টি উপাদানের মাধ্যমে একটি সার্থক গল্প রচনা করা যায়। যথা :

 

১. গল্পের কাহিনি : কাহিনি গল্পের প্রধান উপাদান। গল্প লেখা হয়েছে সেখানে কাহিনি নেই এমনটি হওয়া সম্ভব নয়। এই কাহিনি গঠিত হয় বহু চমকপ্রদ, বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দ্বারা। মনে রাখা দরকার কাহিনি একটি ঘটনা নয়- বহু ঘটনার ওপর নির্ভরশীল। জীবনের সব ঘটনাই গল্পের কাহিনিতে উপস্থিত হয় না। আবার ছোটগল্পে যেমন কাহিনি উপস্থিত হয় তেমনটি হয় না রূপকথা, খুদেগল্পে বা অণুগল্পে। একটি গল্পের প্রাণ নির্ভর করে গল্পের চমকপ্রদ কাহিনির ওপর। এখানে কাহিনি বর্ণনার চেয়ে বিশেষ কাহিনির গুরুত্ব বেশি। দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা আর কাহিনির ঘটনা এক নয়। এই ঘটনা হলো কার্যকরণ শৃঙ্খলাযুক্ত ঘটনা।

রূপকথা আবার ভিন্ন হতে বাধ্য। এখানে বাস্তবতার চেয়ে অবাস্তব, অলৌকিক, উদ্ভট ও ভয়ংকর, অবিশ্বাস্য, অর্থহীন, কল্পিত এবং রোমাঞ্চকর কাহিনি স্থান পায়। রূপকথা নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা চরিত্র অবলম্বন করে রচিত হয় না। রূপকথার কাহিনিতে থাকেÑ নিঃসন্তান বাদশার সন্তান লাভ, জীবজন্তু কর্তৃক মনুষ্যজাতির ভবিষ্যৎ গণনা, বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে সন্ন্যাসীর আগমন, রাজকন্যার প্রতি দৈবসাহায্য, রাজপুত্রের অসাধ্য সাধন ও বিভিন্ন দুঃসাহসিক কাজের পরিচয়, বিপদে সাহায্যের জন্য বনজঙ্গলের পশুপাখি, গাছপালা, মাছ, কীটপতঙ্গ ও নিষ্প্রাণ কিছু এগিয়ে আসা, জড়বস্তুর মুখে ভাষা ইত্যাদি। রূপকথাগুলোর কাহিনি সাধারণত দীর্ঘ এবং বিচিত্র বিষয় ও শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত।

খুদেগল্পের কাহিনি উপন্যাস বা গল্পের মতো কাঠামো অনুসরণ না করে জোরালো ঘটনা বা বহু ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আবার অনুগল্পের কাহিনি উপন্যাস বা গল্পের মতো কাঠামো মেনে তৈরি হয় না। অণুগল্পের কাহিনি জোরালো ঘটনা বা বহু ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। গল্পে উপস্থাপিত জীবন হতে হয়- বাস্তব, আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক অথবা শিক্ষণীয়। গল্পের কাহিনি গঠিত হয়- চরিত্র, সংলাপ, পরিবেশ, লিখনশৈলী বা ভাষা, লেখকের জীবনদর্শন এবং সময়, স্থান ও ঘটনার ঐক্যের সমন্বয়ে।কাহিনি সরল না হলেও এর বাক্যগুলো ছোট ছোট হওয়া দরকার। বাক্য যত সহজ হবে কাহিনির রস গ্রহণ করতে তত সুবিধা হবে।

 

কাহিনি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। হতে পারে বয়স অনুযায়ী, ছোট বা বড় অথবা হতে পারে- ঐতিহাসিক কাহিনি (সেলিনা- হরিসাধান মুখোপাধ্যায়, দালিয়া- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), সামাজিক (পিতাপুত্র- তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, হারানোর নাতজামাই- মানিক বন্দোপাধ্যায়), মনস্তাত্ত্বিক কাহিনি (রামের সুমতি- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, টোপ- নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়), প্রেমবিষয়ক কাহিনি (রাধারাণী- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নষ্টনীড়- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভষ্ম শেষ- প্রেমেন্দ্র মিত্র), গার্হস্থ্য কাহিনি (তিলোত্তমা- বনফুল, খেলা-বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), ভুতুরে কাহিনি (পূজার ভূত- ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, ভয়ের পুকুর- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়), অতিপ্রাকৃত কাহিনি (ছায়া- অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, মাকড়সা- সুধাংশু গুপ্ত), প্রাকৃতি ও মানুষ কাহিনি (তারাপদ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বন মর্মর- মনোজ বসু), ডিটেকটিভ কাহিনি (খুনী- নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, ফাস্টক্লাস কামরা- সত্যজিৎ রায়), সাংকেতিক বা প্রতীকী বা অণু কাহিনি (গুপ্তধন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মরু ও সংঘ- শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজার খেলা- সমরেশ মজুমদার), হাস্য রসাত্মক কাহিনি (স্কুলের মেয়েরা- পরিমল গোস্বামী, রসময়ীর রসিকতা- প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়), অতিমানবীয় কাহিনি (মহেশ- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), পদ্মগোখরো- কাজী নজরুল ইসলাম), বৈজ্ঞানিক কাহিনি (শয়তানের দ্বীপ- প্রেমেন্দ্র মিত্র, শক থেরাপি- সুবোধ ঘোষ, অন্যভুবন- হুমায়ূন আহমেদ), মনুষ্যত্বের কাহিনি (বাঘিনী- শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মিনু- বনফুল, লখার একুশে- রণেশদাশ গুপ্ত), বাস্তবনিষ্ঠ কাহিনি (অঙ্গার- প্রবোধ সান্যাল, বধূবরণ- শৈলজানন্দ, প্রাগৈতিহাসিক- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বস্ত্র- অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত), বিদেশি পটভূমিকার কাহিনি (মাতৃহীন- প্রভাব মুখোপাধ্যায়, সহযাত্রী- রাখাল সেন), উদ্ভট কাহিনি (ভগবতীর পলায়ন- কেদারনাথ মুখোপাধ্যায়, নারায়ণী সেনা- বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়), রোমাঞ্চকর কাহিনি (ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি- সত্যজিৎ রায়), রাজনৈতিক কাহিনি (কয়েকটি সংলাপ- জহির রায়হান, পুরাতন খঞ্জর (শওকত ওসমান), মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি (জননী জন্মভূমি, শওকত ওসমান, ফেরা- হাসান আজিজুল হক, শূন্যবাড়ি- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) ইত্যাদি।

এসব কাহিনিতে তিনটি ঐক্য থাকা জরুরি।

যথা :

Ÿ কাল বা সময়ের ঐক্য : কোন সময় থেকে কোন সময়ের কাহিনি তা পরিষ্কারভাবে বর্ণনায় উপস্থাপন করা হয়।

Ÿ স্থানের ঐক্য : নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চরিত্রগুলো যে পরিমাণ স্থান পরিবর্তন করতে পারে তার ততটুকু দেখানো। এখানে ঘটনার আদি, মধ্য ও অন্ত থাকা প্রয়োজন।

Ÿ ঘটনার ঐক্য : কাহিনির সূচনা, বিকাশ ও পরিণতির মধ্যে সমতা বা সামঞ্জস্য রাখা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় বা খাপছাড়া ঘটনা বা চরিত্র থাকবে না।

কাহিনি বিভিন্ন ধরনের হলেও একটি কাঠামো থাকা জরুরি। গল্পের কাঠামোতে দুই-একটি অঙ্ক কম রেখেও ভালো গল্প রচনা করা যায়। একটি গল্পের ৫টি অঙ্ক-

 

 

0000000

প্রথম অঙ্ক

Ÿ শুরুটা হতে পারে কাহিনির মাঝ/শেষ থেকে

Ÿ নাটকীয় শুরু বা আকর্ষণীয় শুরু

প্রারম্ভ/শুরু/উন্মোচন/মুখসন্ধি/Exposition

যেখানে গল্পের শুরুতে কলাকুশলীর অপরিহার্য তথ্যাদি ও দ্বন্দ্বের পটভূমির সূত্রপাত ঘটে। যেহেতু এটি একটি কাহিনি সেহেতু এখানে নাটক থাকা দরকার। তাই কাহিনির শুরুটা যদি নাটকীয় বা আকর্ষণীয় হয় তাহলে প্রথম অবস্থা থেকেই দর্শককে বসিয়ে রাখার জন্য সুফল বয়ে আনে। শুরুটা এমন একটি অবস্থা যেখানে গল্প, চরিত্র, সংলাপ কী হতে যাচ্ছে বা ঘটতে যাচ্ছে তার একটি ইঙ্গিত থাকে। এখানে চক্রাকারে ঘটনাগুলোর সমন্বয়ে কী ঘটবে তার একটি ইঙ্গিতও পাওয়া যেতে পারে।

এখানে অবশ্যই থাকবে-

পুরো কাহিনির সারকথা বা কাহিনির ভনিতা বা কাহিনি নাটকীয় মুখ।

 

দ্বিতীয় অঙ্ক

Ÿ গোল/উদ্দেশ্য/প্রিমিসিস (সমস্যা, চরিত্র, সংলাপ)

Ÿ কাহিনির ক্রমান্বিত টানটান উত্থান

প্রথম অঙ্ক

Ÿ প্রধান চরিত্রের গুরুত্বারোপ

Ÿ প্রধান চরিত্র ও বিপরীত চরিত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব/চরিত্রের বিকাশ

Ÿ দ্বান্দ্বিকতাপূর্ণ মুহূর্ত রিত্রগুলোর মধ্যে দৃঢ় মেলবন্ধন সৃষ্টি

Ÿ নাট্যক্রিয়া/ Action /সবচেয়ে বেশি কৌশলপূর্ণ/একটু বেশি কৌশলপূর্ণ/সামান্য কৌশলপূর্ণ

Ÿ উৎকণ্ঠা

প্রবাহ অর্থাৎ কাহিনির অগ্রগতি প্রবাহ/প্রতিমুখ সন্ধি/Rising Action

এই অঙ্কে কাহিনিটি এমনভাবে সাজতে হবে যেন কাহিনি দেখার জন্য আগ্রহ তৈরি হয় এবং কাহিনির শুরু থেকে উৎকর্ষ পর্যন্ত নাটকীয়তা সৃষ্টি হয়। কাহিনির উত্থান হবে টানটানপূর্ণ। এ পর্যায়ে গল্পের কাহিনি সংকটময় বা জটিলতম বা তীব্রতর হয়ে ওঠে। এখানে ফল থাকে অনিশ্চিত। এখানে চরিত্র দিয়ে ঘটনা পরম্পরা কাহিনি উপস্থাপন করা হয়। জোরালো কাহিনি উপস্থাপনের জন্য এই পর্বে যা করা দরকার তা হলো :

Ÿ একটি গোল/লক্ষ্য/প্রতিপাদ্য বিষয় থাকা দরকার।

Ÿ কাহিনির ক্রমান্বিত উত্থান দরকার। এর জন্য চাই চরিত্র। প্রধান চরিত্রের উপর গুরুত্বারোপ, চরিত্রের বিকাশ এবং চরিত্রগুলোর মধ্যে দৃঢ় মেলবন্ধন সৃষ্টি করা। প্রধান চরিত্র ও বিপরীত চরিত্রের মধ্যে পূর্ণ দ্বান্দিকতাপূর্ণ সম্পর্ক এবং সমস্যা তৈরি করা। এসব শুধু কাহিনি নয় সংলাপ দিয়েও সৃষ্টি করা হয়। আর সংলাপ যদি জোরালো অর্থাৎ ডাবলমিনিং হয় তাহলে তা হয় সোনায় সোহাগা। সমস্যা, চরিত্র ও সংলাপ উপাদানগুলো গল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

Ÿ দ্বান্দ্বিকতাপূর্ণ মুহূর্ত সৃষ্টি করা। কাহিনিতে দ্বন্দ্ব থাকতে হবে। কাহিনিতে যখন সমস্যা শুরু হয় তখন দ্বন্দ্বও শুরু হয়। দ্বন্দ্ব অর্থ কনফ্লিক্ট ক্ল্যাশ না। এটি হতে শিল্পরূপপূর্ণ দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব সম্পর্কে ড. রাজীব হুমায়ুন চমৎকার বক্তব্য দিয়েছেন, দ্বন্দ্ব আর কিছু নয়Ñযে কোনো নাটকে দুপক্ষের মত-বিরোধ, দ্বিমত, মন কষাকষি এবং সংঘাত-সংঘর্ষই দ্বন্দ্ব। মনে রাখতে হবে, সংঘাত মানে শুধু মারামারি নয়। দুপক্ষের মত, দর্শন, চিন্তা ইত্যাদির ভিন্নতার কারণেও দ্বন্দ্ব বাঁধতে পারে।

যেকোনো কাহিনির মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে। দ্বন্দ্ব একটি কাহিনির পরিপূর্ণতা দেয়। দ্বন্দ্ব তৈরি জন্য পক্ষ লাগে। দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে মত-বিরোধ, মনমানিল্য, সংঘাত, মারামারি ইত্যাদি।

Ÿ নাট্যক্রিয়া চরিত্রের মধ্যে অনুভব শক্তি তৈরি করে তাদের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন দেওয়া প্রয়োজন। চরিত্রের কাজ ও আচরণের মধ্য দিয়ে নাট্যক্রিয়া সৃষ্টি করা সম্ভব। এ সম্পর্কে অভিনয় শিল্পী, লেখক ও শিক্ষক ড. সাধনকুমার ভট্টাচার্য বলেছেন, নাট্যক্রিয়া বা ক্রিয়া বলতে শুধু শারীরিক আচরণ বা পরিস্থিতি সৃষ্টি ক্ষমতা বা পরিবেশকে স্বনিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষমতাই বোঝায় না, মনন অনুভব এমন কি মননশক্তির, অনুভবশক্তির- অভাবজনিত জড়তা ও চরিত্রের আচরণ তথা ক্রিয়া হতে পারে। ক্রিয়া বলতে পাত্র-পাত্রীর আচরণ বোঝায়।

পাত্রপাত্রীর শারীরিক ও মানসিক আচরণকে নাট্যক্রিয়া বলে। নাট্যক্রিয়া ছাড়া কাহিনির নাটকীয়তা বজায় রাখা সম্ভব নয়।

Ÿ উৎকণ্ঠা তৈরি করা। কাহিনি, চরিত্র বা সংলাপের মধ্যে গোপনীয়তা বজায় রাখাই উৎকণ্ঠা বা সাসপেন্স। উৎকণ্ঠা তৈরি করতে পারলে দর্শককে কাহিনির শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। শুধু গোপনীয়তা নয় লুকোচুরিও সাসপেন্সের মধ্যে পড়ে। যত কৌশলে এটি উপস্থাপন করা হয় কাহিনি তত দর্শকপ্রিয়তা পায়।

Ÿ চরিত্রের মধ্যে সমস্যা তৈরি হলে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। আর দ্বন্দ্ব তৈরি হলে এক পর্যায় হাতাহাতি তৈরি হয়। তবে এই হাতাহাতিরও একটি পর্যায় রয়েছে। অ্যাকশন (নাট্যক্রিয়া) আর ফাইটিং (মারামারি/হাতাহাতি) এক নয়। পর্যায়ক্রমিক ও কৌশলপূর্ণভাবে হাতিয়ারটি উপস্থাপন করা দরকার। কাহিনির অগ্রগতি থেকে চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত যদি কয়েকবার মারামারি আসে তাহলে (১) সামান্য কৌশলপূর্ণ, (২) একটু বেশি কৌশলপূর্ণ ও (৩) সবচেয়ে বেশি কৌশলপূর্ণ অর্থাৎ এখানে এসে এটির সমাধান টানতে হয়।

এখানে অবশ্যই থাকতে হবে- বহু ঘটনা উপস্থাপন এবং এদের মেলবন্ধন, বহু চরিত্র উপস্থাপন এবং এদের মেলবন্ধ, প্রধান চরিত্রের প্রকাশ এবং তার গুরুত্ব প্রকাশ, একটি গোল প্রকাশ, অন্যান্য চরিত্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক বা দ্বন্দ্বের দিক, বিপরীত চরিত্রের সঙ্গে প্রধান চরিত্রের দ্বান্দ্বিকতাপূর্ণ সম্পর্ক প্রকাশ ও মনস্তাত্ত্বিক আস্ফালন, প্রধান চরিত্রের সফলতা ও ব্যর্থতার আভাস, কাহিনির নাটকীয়তা প্রকাশ ও উৎকণ্ঠা প্রতিস্থাপন করা ইত্যাদি।

 

তৃতীয় অঙ্ক

Ÿ জয় বা পরাজয়ের পথ নির্ণয়

Ÿ চূড়ান্ত পরিণতি /উৎকর্ষ / Climax

‘‘যেহেতু পরস্পর বিরোধী দুটি সংঘাত চিরকাল চলতে পারে না তাই গল্পের কাহিনিকে এমন একটা স্তরে নিয়ে যেতে হয় যেখানে কোনো একটি শক্তি প্রাধান্য পায় এবং সেই শক্তিটিই জয়ী হয়। কাহিনির গতিপথে আবির্ভূত এই সন্ধিকেই বলে উৎকর্ষ বা ক্রাইসিস বা ক্লাইম্যাক্স। যেখানে কাহিনি একাধিক সংঘাতের ধারায় ক্রমান্বয়ে গতিশীল সেখানে ওই সংঘাতগুলোর মধ্যে প্রধান সংকটটিকেই ‘উৎকর্ষ’ বলতে হবে। তবে সূচনা-প্রারম্ভ-প্রবাহ-উৎকর্ষের ক্রমোন্নয়নের মধ্যবর্তী ব্যবধান সব সময় একরকম নয়। কাজেই সব নাটকের ক্রাইসিস একই সময় আসে না। (সাহিত্যের রূপ-রীতি, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার, পৃ. ১১৩)।’’ এ স্তরে গল্পের চরিত্র বা চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব টানটান, উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা অবস্থায় থাকে। এবং কাহিনি প্রবল শক্তি সংঘর্ষের চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছায়। এটি হলো সবচেয়ে চিন্তাশীল স্তর।

এখানে অবশ্যই থাকতে হবে- কাহিনি/সংঘর্ষের চূড়ান্ত পর্যায়, প্রধান চরিত্র বা বিপরীত চরিত্রকে প্রাধান্য দিয়ে জয় বা পরাজয়ের দিকটি।

চতুর্থ অঙ্ক

Ÿ সমাধানহীনতার দ্বন্দ্ব

Ÿ প্রায় সমাধান

Ÿ পরিণতির দিকে উত্তরণ

গ্রন্থিমোচন /বিমর্ষসন্ধি /সঙ্কট মোচন/Falling Action

এ অঙ্কে গল্পের চরিত্র বা চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব স্তিমিত হয়ে যায়। এখানে কমতে থাকে উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা। সৃষ্ট জটিলতম অবস্থা পরিণামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এখানে পাঠক বা দর্শক একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। পর্যায়টি ক্ষুদ্র পরিসরের বলে দ্বন্দ্বের উপসংহার টানা হয়। এই স্তরে পাওয়া যায় ফাইনাল সাসপেন্স।

এখানে অবশ্যই থাকতে হবে- চূড়ান্ত সাসপেন্স, সংকট মোচন, মিলন।

পঞ্চম অঙ্ক

Ÿ নতুন স্বপ্ন বা বক্তব্য

Ÿ সংঘর্ষের সম্পূর্ণ সমাধান

Ÿ মিলন বা বিচ্ছেদ

সমাপ্তি/উপসংহার/শেষ/সংঘর্ষেরসমাধান/বিমোক্ষণ / Catastrophe

এ অঙ্কে গল্পের মধ্যে নাট্যিক দ্বন্দ্বের পরিণাম মুখে যাত্রা করে এবং অবসানে পৌঁছায়। এখানে কাহিনির সমাধান পাওয়া যায়। পাওয়া যায়, একটি নতুন দার্শনিক বিষয় যা আয়নার মতো আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হয়।

এখানে অবশ্যই থাকতে হবে- নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন ও নতুন বিষয় উপস্থাপন, ঘুরে দাঁড়াবার, নতুন গন্তব্য খোঁজার ইঙ্গিত।

কাহিনি তৈরিতে প্রধান ৪টি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। যথা:

Ÿ জীবনঘনিষ্ট জীবনযাপন, চরিত্র ও সংলাপূর্ণ কাহিনি তৈরি করা।

Ÿ ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।

Ÿ জীবনের ঘটনাগুলোর চমকপ্রদ, নাটকীয় অংশ তুলে আনা।

Ÿ ক্ষুদ্র পরিশরে কাহিনি বর্ণনা করা।

খুদেগল্পের ক্ষেত্রে- একটি ঘটনা স্থাপন করা।

অণুগল্পের ক্ষেত্রে- কাব্যিক ও রূপক বর্ণনা করা এবং কাহিনির ঘটনা আড়াল রাখা।

বাংলা সাহিত্যে বহু বিখ্যাত কাহিনিপ্রধান গল্প লেখা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো- ছুটি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), বলাই (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), তোতাকাহিনি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), হৈমন্তী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), অপরিচিতা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), দেনাপাওনা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), সুভা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), আম আঁটির ভেঁপু (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), পড়ে পাওয়া (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), আহ্বান (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), তৈলচিত্রের ভূত (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়), মাসিপিসি (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়), মমতাদি (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়), অতিথির স্মৃতি (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), লালু (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), বিলাসী (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), অভাগীর স্বর্গ (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), মহেশ (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), নিমগাছ (বনফুল), মিনু (বনফুল), মানুষের মন (বনফুল), লাল গরুটা (সত্যেন সেন), মাল্যদান (রণেশ দাশগুপ্ত), গুরুচ-ালী (শিবরাম চক্রবর্তী), বুলু অজিত (কুমার গুহ), রিলিফওয়ার্ক (আবুল মনসুর আহমদ), রসগোল্লা (সৈয়দমুজতবা আলী), দুই মুসাফির (শওকত ওসমান), মহুয়া (দ্বিজ কানাই), একটি তুলসিগাছের কাহিনি (সৈয়দ ওয়ালীউল্ল¬াহ), মানুষ (মুনীর চৌধুরী), একই সমতলে (শাহেদ আলী), তোলপাড় (শওকত ওসমান), আয়না (জসীমউদদীন), আদুভাই (আবুল মনসুর আহমদ), অলক্ষুণে জুতো (মোহাম্মদ নাসির আলী), চরু (হাসান আজিজুল হক), জোঁক (আবু ইসহাক) ইত্যাদি।

 

২. গল্পের চরিত্র : চরিত্র গল্পের অরেকটি অন্যতম উপাদান। কাহিনি আছে চরিত্র নেই তেমনটি ভাষা সম্ভব নয়। গল্পের লক্ষ্য মানবজীবনের সঠিক সত্যের প্রকাশ। এ কারণেই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষ বা চরিত্র। আমাদের সাধারণ চোখে দেখা খণ্ড খণ্ড মানুষ নয়, ক্রীড়াশীল অখণ্ড মানুষ। তার কাজ হয়তো সামান্য বা অসামান্য। তার জীবনকাল কয়েক বছরের বা বহু বছরের। তবে কাহিনির প্রয়োজনে উঠে আসে গোটা চরিত্রের বিশেষ বিশেষ কার্য, চুম্বক কার্য। চরিত্রের চলন বা গতি ঘটনার শেষ পরিণতি প্রদান করে।

চরিত্র যদি ঘটনা না ঘটায় তাহলে কাহিনি স্থবির হয়ে যায়। ঘটনা ঘটানোর জন্য চরিত্রের তিনটি পর্যায়ে থাকে। যথা :

Ÿ চরিত্র : চরিত্র হলো সম্পূর্ণ দোষেগুণে মানুষ বা জীবন।

Ÿ চরিত্রের বিশেষ দিক: ক্যারেকটারাইসটিক হলো গোটা মানুষের বিশেষবিশেষ আদল বা পার্থক্য প্রকাশ পায় অর্থাৎ ম্যানারিজম থেকে যা প্রকাশ পায় বা মানুষের এমন কিছু মুদ্রাদোষ যা অন্য মানুস থেকে পৃথক করে। সেসব দিক উপাস্থাপন করা।

Ÿ চরিত্রের বিশেষ চিহ্নিত দিক : ক্যারেকটারাইসটিক হলো জীবনের নির্বাচিত অংশ যা থেকে চরিত্রকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায়। চরিত্রের ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে এটি চিহ্নিত করা যায়। যেমন:

Ÿ শারীরিক সত্তা : চরিত্রের দৈর্ঘ্য, রং, চুলের স্টাইল, সেক্স ইত্যাদির মাধ্যমে চরিত্র নির্ণয় করা যায়।

Ÿ সামাজিক সত্তা : সামাজিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে চরিত্র নির্ণয় করা যায়।

Ÿ মানসিক সত্তা : চরিত্রের স্বভাব প্রকাশের মাধ্যমে চরিত্র নির্ণয় করা যায়।

চরিত্রের ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য তথা শারীরিক, সামাজিক ও মানসিক অবস্থা ভালোভাবে না জানলে মানুষকে জানা হয় না। আর মানুষকে না জানলে চরিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। প্রত্যেক মানুষের মাঝে অবিরাম এক পরিবর্তন প্রবাহ চলে তাই জানা দরকারÑ

Ÿ চরিত্রটির নাম কী? অর্থাৎ চরিত্রটির পরিচিতি কী?

Ÿ চরিত্রটির বয়স কত?

Ÿ চরিত্রটির সামাজিক অবস্থান কী? (সাধারণ, সমাজসেবী, প্রভাবশালী)।

Ÿ চরিত্রটির আর্থিক অবস্থান কী? (নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত)।

Ÿ চরিত্রটির পেশাগত অবস্থান কী? (চাষি, দোকানদার, উকিল, ছাত্র)।

Ÿ চরিত্রটির কোনো বিশেষ আচার-আচরণ আছে কি না?

Ÿ অভিনয়কালীন অগ্রসরমানতায় চরিত্রটির ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব কতটুকু?

Ÿ চরিত্রর জন্যে কোনো বিশেষ মেকাপ-গেটাপ আছে কি না?

Ÿ চরিত্রটির সঙ্গে অন্যান্য চরিত্রের সম্পর্ক কী?

Ÿ বাচনভঙ্গি, উচ্চারণ, বাক্য প্রক্ষেপণে কোনো বিশেষ ভঙ্গি আছে কি না?

Ÿ চরিত্রটির শেষ পরিণতি কী?

Ÿ চরিত্র বিশ্লেষণের প্রধান উপাদান হলো মানব প্রকৃতির স্বভাবজনিত অবস্থান নির্ণয়।

গল্পের চরিত্র বড় বিচিত্র। গল্প, রূপকথা, খুদেগল্প আর অণুগল্পের চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন হতে বাধ্য তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। যেমন : রূপকথায় থাকে ফ্যান্টাসি ধরনের চরিত্র। যেমন: ড্রাগন, দৈত্য-দানব, ডাইনি, রাক্ষস-খোক্কস, সন্ন্যাসী, পরি, মৎস্যকন্যা, সবাক প্রাণী, ট্রোল, কাল্পনিক ঘোড়া, জাদুকর, বীর-পালোয়ান, রাজা-রানি, রাজপুত্র-রাজকন্যা, উজিরপুত্র-কোটালপুত্র।

অণুগল্পে অল্প চরিত্র থাকে তবে অণুগল্পের চরিত্র একটু আলাদা। অণুগল্পের প্রধান চরিত্রের সঙ্গে সহযোগী চরিত্র একেবারেই ভিন্ন হতে বাধ্য। প্রধান চরিত্র যদি মানুষ হয় তাহলে সহযোগী চরিত্র হবে গাছপালা, পশুপাখি, ফুল, লতাপাতা ইত্যাদি। এসব চরিত্র আবার সৎগুণে পূর্ণ। এগুলোর চরিত্রগুণ প্রধান চরিত্রের গুণ প্রকাশে সহায়ক। এরা প্রধান চরিত্রের ঘটনাও প্রকাশ করে।

গল্পটি যদি খুদেগল্প হয় তাহলে এক বা একাধিক চরিত্র থাকা জরুরি নয়। প্রধান চরিত্রকে কেন্দ্র করে একটি বা দুটি চরিত্র আর্বতিত হবে অপ্রধান বা এন্টিচরিত্র হিসেবে। অপ্রধান চরিত্রও কাহিনিতে একটি জাল সৃষ্টিতে সহায়ক। প্রধান চরিত্র লেখক হতে পারে বা বিশেষ কেউ হতে পারে। প্রধান চরিত্র লেখক হলে সেটি উত্তম পুুরুষে কাহিনি বর্ণনা করতে পারে। চরিত্রগুলো সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার সাথে সাথে কাহিনিকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যায়।

ঘটনা ঘটানোর জন্য চরিত্রের ৫টি পর্যায়ে থাকা জরুরি। যথা:

Ÿ কাহিনি ঘটনাগুলো প্রকাশ করবে এবং কাহিনি শেষপর্যন্ত এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

Ÿ কাহিনি গতিশীল করতে ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে চরিত্র থাকবে।

Ÿ মানুষের বিশেষ জীবন উপস্থাপন করবে।

Ÿ মানুষের কিছু মুদ্রাদোষ উপস্থাপন করবে যেগুলো অন্য চরিত্র থেকে পৃথক করবে।

Ÿ  বিশেষ চিহ্নিত দিক প্রকাশ করবে।

বাংলা সাহিত্যে বহু গল্পে বিখ্যাত চরিত্র নির্মিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে হলো- ফটিক (ছুটি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), কাদম্বিনী (জীবিত ও মৃত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), মৃন্ময়ী, অপূর্ব (সমাপ্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), সুভা (সুভা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), রতন (পোস্টমাস্টার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), রহমত, খুকি (কাবুলিওয়ালা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), চারু (নষ্টনীড়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), অপু (হৈমন্তী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), ক্ষেন্তি (পু্ইঁমাচা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), সখী (তারিণী মাঝি, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়), ভিখু, পাঁচী (প্রাগৈতিহাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়), গফুর, আমিনা (মহেশ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), ম্যাগী (ফুলের মূল্য, প্রভাতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়), শিউলি, আজহার (শিউলিমালা, কাজী নজরুল ইসলাম), জোহরা (পদ্ম-গোখরা কাজী নজরুল ইসলাম), আমু (নয়নচারা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ) প্রমুখ।

 

৩. গল্পের সংলাপ : গল্পের আরেকটি মূল উপাদান হলো সংলাপ। পাত্রপাত্রীর কথোপকথন উপন্যাসের গুরুত্ব বেশি থাকলেও গল্পে খুবই কম। গল্প ও রূপকথায় সংলাপ থাকলেও খুদেগল্প ও অণুগল্পে তেমন সংলাপ আশা করা যায় না।অণুগল্পের বৈশিষ্ট্য অনুসারে প্রয়োজনে দু-চারটি সংলাপ আশা করা যায়। সংলাপ অনেক ক্ষেত্রে ছরিব মতো কাজ করে যা বর্ণনায় সম্ভব নয়। রূপকথার যেসব চরিত্র থাকে সেগুলোর মুখে থাকে সংলাপ। জীবজন্তু ও গাছপালাও কথা বলে।

সংলাপ কি থাকতেই হবে। না সৃজনশীল রচনা এমন কড়াকড়ি নিয়ম মানতে নাও পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘একরাত্রি’ গল্পে একটিও সংলাপ রচনা করেননি। আবার ‘ছুটি’ গল্পে শুরু ও শেষভাগে সংলাপ দিয়েছেন আবার কোনো কোনো গল্পে প্রচুর সংলাপ ব্যবহার করেছেন। আসলে সংলাপ লেখকের কাহিনির বর্ণনা ও চরিত্রের প্রয়োজনে উপস্থাপিত হয়।

সংলাপ প্রধানত ৫টি কাজ করে থাকে। যথা:

Ÿ সাবলীল, সহজ-সরল, প্রয়োজনীয়, শুদ্ধ ও উপমাযুক্ত স্বাভাবিক সংলাপ গল্পের পক্ষে বিশেষ সহায়ক।

Ÿ সংলাপের কারণেই কাহিনি গতিশীল হয়, পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

Ÿ চরিত্রের স্বরূপ ও মনোভাব প্রকাশ করে এবং চরিত্রের মধ্যে সম্পর্ক প্রকাশ করে।

Ÿ কী ঘটছে এবং কী ঘটতে যাচ্ছে তার ইঙ্গিত দেয়।

Ÿ সংলাপ চরিত্রের অবস্থানও নির্ণয় করে। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত এবং শ্রেণি থেকে সংলাপ হওয়া জরুরি।

 

৪. গল্পের পরিবেশ সৃষ্টি : জীবনের জন্য যেমন পরিবেশ থাকে তেমনি গল্পের জন্য থাকে না। তবে গল্পের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করে নিতে হয়। এই পরিবেশ হতে পারেÑ চমকপদ, উদ্ভট, জীবনঘনিষ্ট, ভুতুরে, গোয়েন্দা, কাল্পনিক ইত্যাদি। কাহিনি যে পরিবেশে সৃষ্টি করা হয় সেই পরিবেশে যেসব চরিত্র থাকে তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন জোরাল হতে হয়। গল্প, রূপথা, ক্ষদেগল্প বা অণুগল্পই হোক না কেন একটি উপযুক্ত পরিবেশষ সৃষ্টি করা চাই চাই। তবে গল্প অনুসারে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। জীবনের জন্য যেমন পরিবেশ থাকে তেমনি রূপকথার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এই পরিবেশ হবে অলৌকিক। কাহিনি ও চরিত্র অনুসারেই পরিবেশষ সৃষ্টি করতে হয়। কাহিনি যদি হয় নিম্নশ্রেণির, চরিত্র যদি হয় বস্তির তাহলে পরিবেশ তেমনটি আশা করতে হবে।

পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রধান ৪টি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। যথা:

Ÿ বিশ্বাসযোগ্য করে পরিবেশ সৃষ্টি করা।

Ÿ উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে গল্পটি কাহিনিপ্রধান করা।

Ÿ কাহিনির ঘটনাগুলো শক্তিশালী করে পরিবেশ সৃষ্টি করা।

Ÿ চরিত্র এবং চরিত্রের অবস্থান অনুযায়ী পরিবেশ সৃষ্টি করা।

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান গল্পকারদের গল্পের মধ্যে উপযুক্ত পরিবেশ লক্ষ করা যায়। যেমন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরÑ একরাত্রি, মধ্যবর্তিনী, দেনাপাওনা, ভিখারিনী, নষ্টনীড়, সমাপ্তি, জীবিত ও মৃত, ছুটি, অতিথি, পোস্টমাস্টার, ক্ষুধিত পাষাণ, হানাদার গোষ্ঠী, কাবুলিওয়ালা, শুভা, শাস্তি, ল্যাবরেটরি, হৈমন্তী, অপরিচিতা ইত্যাদি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- সতী, মন্দির, বিলাসী, মহেশ, অতিথির স্মৃতি, অভাগীর স্বর্গ। কাজী নজরুল ইসলাম- শিউলিমালা, পদ্মগোখরো, ব্যথার দান, জিনের বাদশা, রিক্তের বেদন, মেহের নিগার। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়- পুঁই মাচা, মৌরীফুল, মেঘমল্লার। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়- কালাপাহাড়, ডাকহরকরা, জলসাঘর। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়- রানুর প্রথম ভাগ। বুদ্ধদেব বসু- আমরা তিনজন। হাসান আজিজুল হক- আত্মজা ও একটি করবী গাছ, নামহীন গোত্রহীন, শকুন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়- টোপ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ- নয়নচারা, একটি তুলসী গাছের কাহিনি। আবু ইসহাক- জোঁক, মহাপতঙ্গ। সৈয়দ শামসুল হক- মানুষ। শামসুদ্দীন আবুল কালাম- পথ জানা নাই। আলাউদ্দিন আল আজাদ- শিষ ফোটার গান। হুমায়ূন আহমেদ- জলপরী, খাদক।

৫. গল্পের ভাষাশৈলী ও উপস্থপান শৈলী : একটি গল্প উপস্থাপনের জন্য যেমন ভাষা জরুরি তেমনি গল্পেরও নিজস্ব একটি ভাষা-দান জরুরি। ভাষা শুধু কাহিনি নয় পরিবেশও সৃষ্টি করে। কাহিনির ভাষাগত অবয়ব বা কাঠামো সংস্থাপনের ভিত্তি হলো লিখনশৈলী। কাহিনির বর্ণনা, পরিচয়, পটভূমি উপস্থাপন এবং চরিত্রের স্বরূপই গল্পে প্রাণ। উপজীব্য বিষয় এবং ভাষার সামঞ্জস্য রক্ষার মাধ্যমে কাহিনি হয়ে ওঠে সমগ্র, যথার্থ ও স্বার্থক আবেদনবাহী। একজন লেখকের শক্তি, স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতার পরিচায়ক হলো ভাষাশৈলী। একজন গল্পকারের গল্পের ভাষা ও রচনাশৈলী আলাদা হতে হয়। এটিও লেখককে চিনতে সাহায্য করে।

ভাষাশৈলী রক্ষা করার জন্য প্রধান ৫টি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। যথা:

Ÿ ছোট ছোট বাক্যে ভাষা উপস্থাপনশৈলী বোধগম্য করে।

Ÿ লেখকের নিজস্ব ভাষাশৈলী গল্পটির স্থায়ীত্ব দান করে।

Ÿ ভাষাশৈলী গল্পের আকার, গঠন, নৈপুণ্য ও চরিত্র সৃষ্টিতে সহায়ক।

Ÿ ভাষাশৈলীতে উঠে আসে কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ, পরিবেশ তথা জীবন।

Ÿ ভাষাশৈলীর মাধ্যমে উপজীব্য বিষয় এবং কাহিনি হয় সমগ্র, যথার্থ ও স্বার্থক আবেদনবাহী।

বাংলা সাহিত্যের এমন অনেক গল্প রয়েছে যেগুলোর শক্তিশালী ভাষা ও উপস্থাপনশৈলীর কারণে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। যেমন : ছুটি, দালিয়া, হৈমন্তী, নষ্টনীড় (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), প্রতœতত্ত্ব, জলসা ঘর (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), রস (নরেশ মিত্র), টোপ (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়), তিলোত্তমা (বনফুল), খেলা (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), মরু ও সংঘ (শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়), মধু ও হুল (সজনীকান্ত দাস), রাজটিকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), নিরুদ্দেশ (প্রেমেন্দ্র মিত্র), মিনু (বনফুল), জননী জন্মভূমি (শওকত ওসমান), ফেরা (হাসান আজিজুল হক), জোঁক (আবু ইসহাক), দুই মুসাফির (শওকত ওসমান), পালামৌ (সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), আম আঁটির ভেঁপু (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়), নিমগাছ (বনফুল), মানুষ (মুনীর চৌধুরী), একই সমতলে (শাহেদ আলী) ইত্যাদি।

অন্য গল্পের থেকে অনুগল্পের উপস্থাপশৈলী একটু আলাদা। অণুগল্পে বিনোদন বা হাস্যরসের জায়গা নেই বললেই চলে। অণুগল্পে মনন বা বোধের জায়গা বেশি। অণুগল্পে বিনোদনের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তির কাজ করে বেশি। অণুগল্প উপস্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট একটি কাঠামো রয়েছে। যেমন:

Ÿ অণুগল্পের কাহিনি তিনটি অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করা।

Ÿ ১ম অনুচ্ছেদে সহজগল্প থাকে, ২য় অনুচ্ছেদে কাহিনির রূপক বর্ণনা আর ৩য় অনুচ্ছেদে থাকে চমকানোর মতো কথা। এগুলো আগের অনুচ্ছেদে সাথে কথায় মিল না থাকলেও রূপকার্থে মিল থাকবে। শেষপর্বে বলিষ্ঠ ও অগাধ জীবনবোধপূর্ণ উপস্থাপন যার উদগাতা তৃতীয় নয়ন।

Ÿ অণুগল্পের বাক্য কবিতার মতো শক্তিশালী, দৃঢ় ও অলংকারময় অর্থাৎ উপমা ও চিত্রকল্পময়। অণুগল্পের গদ্য হলেও উপস্থাপন কাব্যিক, ব্যঞ্জনাময়, রূপক বা প্রতীকী ও চিত্রকল্পময়।

Ÿ অনুগল্পের চরিত্র সরাসারি না এসে কোনো গাছ বা প্রাণী আসতে পারে। যেমন এসেছে ইশপ, তলস্তয়, বনফুলের গল্পে। অণুগল্পের নীতিকথা থাকে আড়ালে।

 

উপসংহার

একটি গল্পে শুধু উপরের উপাদানগুলো থাকলেই হবে না, একজন লেখকের জীবনদর্শন, প্রজ্ঞা ও চর্চার ওপর নির্ভর করে ভালো গল্প রচনা। যার জীবনদর্শন, প্রজ্ঞা ও চর্চার যত বেশি তিনি তত ভালো রচনা উপস্থাপন করতে পারবেন। জীবনকে খুঁটে খুঁটে দেখার মনোভাব সৃষ্টি করা। জীবনের বিশেষ কোনো দিকের ইঙ্গিত, নাটকীয় শুরু ও শেষ এবং মেদহীন ও ভণিতাহীন বর্ণনা করা। জীবনযুদ্ধ অবতীর্ণ মানব সত্য চরিত্র সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা। কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ ও পরিবেশ সৃষ্টি এবং উপস্থাপনশৈলী নির্ভর করে জীবনদর্শন, প্রজ্ঞা ও চর্চার ওপর।

লেখক : সাহিত্য ও চলচ্চিত্র গবেষক

 

আরো পড়ুন: হাসান আজিজুল হকের গল্প

ফেসুবক: সুধাপাঠ সাহিত্য পত্রিকা

error: Content is protected !!