fbpx

মেঘের ইস্টিশন: আখতারুল ইসলামের কিশোর গল্প

সেরিনা ক্লাস ফোরে পড়ে। বাসার পাশেই ইশকুল। রুটিন মেনে তার পড়ালেখা, খেলাধুলার সুযোগ নেই বললেই চলে, সুযোগ থাকলেও সে কার সাথে খেলবে, কাজের মেয়ে রুবিটাও সময় পেলে রিমোট নিয়ে টিভির সামনে বসে পড়ে, সেরিনার প্রতিদিন টিভি দেখতেও ভালো লাগে না। তার ভালোলাগা বাবা আকমল হোসেন মা হোস্নে আরা বোঝে না। বুঝতে চেষ্টাও করে না। সেরিনা পৃথিবীতে চার দেয়ালের ঘর, ইশ্কুল বিল্ডিং আর সামান্যটুকু বাসা থেকে স্কুলে যাওয়ার রাস্তা এছাড়া আর কিছুই নেই। বাবা বড় ব্যবসায়ী, মন খোলে যে তার সাথে কথা বলবে সে সময়টুকু আকমল সাহেবের বের করা অসম্ভব, মা কলেজ টিচার, মাও ভীষণ ব্যস্ত নোট, সাজেশন, কলেজ, ক্লাশ, পরিক্ষা, ডিউটি, সময় হয়ে ওঠে না কারো। সেরিনা যেন ঘরে পোষা বেড়াল বা পাখি। যদিও তাদের ঘরে বেড়াল পাখি কোনটাই নেই। পোষা বিড়াল ও খাঁচার পাখির মত ছকে বাঁধা সেরিনার জীবন। তবে সেরিনার ভালো লাগে ঘরের দখিণের বেলকনি। ইজি চেয়ারে বসে পড়ন্ত বিকেলে পা দুলিয়ে দুলিয়ে কখনো দূরের আকাশ দেখে, দেখে সাদা কালো মেঘের ছোটাছুটি, রকেট, বিমান ও হেলিকপ্টারের উড়ে যাওয়া, দু’একটা পাখি দেখা যায় কখনো তবে কাক দেখা যায় বেশি। কখনো কখনো নিজের অজান্তে মেঘের সাথে কথা বলে।

সেরিনা বলে, এই মেঘ কখনো মেঘ, ডাকতে ডাকতে হঠাৎ দেখে-

একটা টুকরো মেঘ সাদা পাঞ্জাবী পড়ে, রোদের বিন্দুকণায় লাল টুকটুকে চোখে রবীন্দ্রনাথ হয়ে যায়, সেরিনা অবাক, বিশ্বাসব করতে পারে না, বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মেঘের রবীন্দ্রনাথ বলল, কি হয়েছে সেরিনা?

সেরিনা বলল, রবীন্দ্রনাথ!

হ্যাঁ, ভয় পেয়ো না।

না, আমি ভয় পাই না আমি তোমার ছুটি কবিতা পড়েছি

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

বাদল গেছে টুটি!

আজ আমাদের ছুটি ও ভাই,

আজ আমাদের ছুটি।

তুমি খুব লক্ষী মেয়ে।

না আমি লক্ষী না, আমি তো খাঁচার পাখি, টিয়ে পাখি, টিয়ে পাখির মত পোষা।

কে বলেছে?

দেখো না কোন ছুটি নাই, সারাদিন শুধু একা একা থাকি, কেউ আমার সাথে খেলে না।

তোমার কী মেঘের মত ছুটতে ইচ্ছে করছে।

হ্যাঁ, আমি মেঘ হতে চাই?

সত্যি!

হ্যাঁ, এক, দুই, তিন সত্যি!

বলতে বলতে রবীন্দ্রনাথ খুব কাছে আসে, জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ায়, বলল সেরিনা আসো তোমাকে আকাশে মেঘের দেশে আমাদের একটা ইস্টিশন আছে সেখানে নিয়ে যাই!

সেরিনা বলল কীভাবে?

তুমি আমার হাত ধরো দেখবে ঠিকই পৌঁছে যাবে।

হাত বাড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরতেই সেরিনা চলে যায় মেঘের দেশে, রবীন্দ্রনাথ বলল, সেরিনা কেমন লাগছে তুমি মেঘ, আমিও মেঘ! ভালো লাগছে মেঘ হতে পেরে, সেরিনা বলল অবশ্যই, আমার অনেক দিনের ইচ্ছে পূরণ হল।

রবীন্দ্রনাথ বলল, সেরিনা হোসেন মেঘ

রবীন্দ্রনাথ মেঘ

মেঘের বাড়ি মেঘের ঘর

সবাই আপন-নয় তো পর

সেরিনা বলল দারুণ, আসলে তুমি রবীন্দ্রনাথ, তোমার তুলনা তুমি। বিশ্বকবি, পৃথিবীর কবি।

ওড়ে ওড়ে কালো কোর্ট পড়ে সাদা চুলের একটা মেঘ মানুষ ছুটে আসছে! সেরিনা বলল, রবি ঠাকুর ওনি কে?

তুমি চেনো না, ওনি আইনস্টাইন

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন!

ঠিক ধরেছো।

আচ্ছা তুমি না হয় ছড়া কবিতা গান গল্প লিখছো, বলে এখানে কিন্তু আইনস্ট্যাইন ওনি এখানে কী করছে?

ওনি এখানে গবেষণা করছে।

ওনার পেছনে কতগুলো মানুষ, অদ্ভূত সব মানুষ। ওরা তো মেঘ মানুষ না। ওরা কোথা থেকে এলো।

সেরিনা, সব জানতে পারবে, আমরা এখানে থাকি তা মেঘের ইস্টিশন, যেখানে মাটি বা ছাদ নেই! এখানে সবাই মেঘের মত উড়তে পারে, এটা হলো শূন্যের ইস্টিশন, এখানে-শুধু আইনস্টাইন না- নিউটন, ডারউইন, ডাল্টন, ব্যাবেজ, সলিম আলী, অ্যারিস্টটলসহ অনেক জ্ঞানী বিজ্ঞানীরা আছে, যাদের আবিষ্কার ও কাজে পৃথিবী আজকের এই অবস্থায় উন্নীত হয়েছে।

 

আচ্ছা সব বুঝলাম, তুমি বললে নাতো, আইনস্টাইনের পিছনে ওরা কারা।

ওরা, ভিন গ্রহের প্রাণী, কেউ প্লুটো থেকে এসেছে, কেউ মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছে, কেউ লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ থেকে এসেছে। এরা মাহজাগতিক প্রাণি। তোমরা পৃথিবীতে এলিয়েন বলো, তারা, ওরা কি করতে এসেছে এখানে।

এই স্টেশন সবার, এখানে কেউ কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করে না, মারামারি করে না, সবাই ভালো, বিভিন্ন গ্রহের অধিবাসীরা, যারা ওদের গ্রহ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। সে সব জ্ঞানী, মহাজ্ঞানীদের মিলন মেলা এই ইস্টিশন, মেঘের ইস্টিশন।

সেরিনা থ্ হয়ে ভাবতে থাকে, বাবা-মা’র কথা।

বাবা-মা, মাঝে মাঝে যে ঝগড়া করে, তা তুমুল ঝগড়া, চাকুরি নিয়ে ঝগড়া হয়। বাবা, মাকে বকা দেয়। মাও বাবাকে বাজে বাজে কথা বলে।

রবীন্দ্রনাথ বলল কি ভাবছো সেরিনা?

না, মানে, ইয়ে……….

থাক্ সেরিনা তোমাকে বলতে হবে না, আমি জানি তুমি কী ভাবছো, আমরা মানুষের মনের খবর জানি, মুখ দেখলে বুঝতে পারি, এই যে বুঝতে পারা তাকে কী বলে জানো?

সেরিনা বলল, না।

এটাকে বলে সিক্স সেন্স, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়।

সত্যি! বল দেখি আমি কী ভাবছিলাম।

তুমি তোমার বাবা-মার ঝগড়ার কথা ভাবছিলে তাই না?

সত্যি তো! সেরিনা অবাক হয়, কেমন করে বুঝলে?

আচ্ছা রবিঠাকুর আমিও তোমার মত হতে চাই।

তুমি এখন না বললে, মেঘ হবে। আবার বলছো আমার মত হবে, দেখবে আমার চেয়ে বেশি জানে এমন অনেকে আছে, এই ধরো- বর্তমানে যারা কম্পিউটার, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন রোগ-শোক, মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণা করছে, যারা মানুষের উন্নয়নে কাজ করছে। আইনস্টাইন-নিউটন এদের মত।

ওরা আমার চেয়েও বেশি জানে।

হ্যাঁ, সব মানুষ তো এক রকম না, এক একজন এক একটা বিষয়ে পারদর্শি, ওরা পদার্থ নিয়ে গবেষণা করে। কেউ জ্যোতিষ্ক নিয়ে গবেষণা করে, কেউ চিকিৎসা নিয়ে, অনেক সময় তোমরা ছোটরাও অনেক কিছু জানো। যা আমরা বড়রাও জানি না, মানুষ সবার কাছে শিখতে পারে। শিখতে কোন ক্ষতি নাই।

বলতে বলতে আইনস্টাইন বলল, সেরিনা কেমন আছো? সেরিনা বলল, ভালো।

ওপাশ ওড়ে যাচ্ছে। কিছু ভিন গ্রহের প্রাণী, একটা বলল, হাই সেরিনা।

সেরিনা থ্ মেরে বসে আছে মেঘের পিঁড়িতে।

রবীন্দ্রনাথ বলল, তুমিও হাই বল।

সেরিনা এবার বলল, হাই।

বাতাসের ঘূর্ণিতে শো শো শব্দ করছে।

আইনস্টাইন বলল, বাতাসে বাতাসে সংঘর্ষ হচ্ছে, কিছু বাতাস উত্তর দিক থেকে আসে কিছু বাতাস দক্ষিণ থেকে মুখোমুখি সংঘর্ষ। বাতাসের উপর ভাসতে থাকা মেঘেরা ছোটাছুটি করছে। রবীন্দ্রনাথ বলল, আইনস্টাইন এটা কি থামানো যায়।

থামানো যাবে না, এর গতিবেগ হাজার কি.মি এর উপরে। আশে-পাশে যা আছে সবাই ছিটকে পড়বে কেউ বিভিন্ন মহাসাগরে, কেউ কেউ বরফ দেশে, কেউ অন্য গ্রহে, কেউ গিয়ে পড়বে জলন্ত আগ্নেয়গিরিতে, সূর্য বা জলন্ত কোন নক্ষত্রে, কেউ পড়বে গিয়ে মরুভূমিতে।

কোত্থেকে ছুটে এসে নিউটন বলল, এখন কি করা যায়?

সেরিনার চোখে পানি আসে, বলল আমার ভয় করছে, রবি ঠাকুর আমাকে দিয়ে এসো।

আইনস্টাইন বলল, সেরিনা ভয় নেই, আমরা তো আছি। নিউটন, চলো বাতাসের গতি পরিবর্তন করতে পারি কিনা।

নিউটন বলল, গুড আইডিয়া।

কিন্তু কিভাবে? দক্ষিণ মুখি বাতাসের গতিকে পশ্চিম মুখি করলে আর উত্তরমুখিকে পূর্ব দিকে করলে সংঘর্ষ এড়ানো যাবে।

এই বলে নিউটন ও আইনস্টাইন গেলো বাতাসের সংঘর্ষ এড়ানোর উদ্দেশ্য।

সেরিনা বলল, রবি ঠাকুর যদি বাতাসের গতি পরিবর্তন করতে না পারে কী হবে?

কিছুই হবে না ঘূর্ণি বাতাস হবে, কিছু ক্ষয়-ক্ষতি হবে।

কিন্তু সেরিনা, মানুষের পক্ষে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

নিউটন আইনস্টাইন নিশ্চয় এই ঘূর্ণি বাতাস থেকে আমাদের রক্ষা করতে চেষ্টা করবে। কীভাবে দিক পরিবর্তন করা যায়। সব পদার্থের খেলা। বুঝলে সেরিনা, এটা তো কবিতা দিয়ে হবে না।

হ্যাঁ, রবি ঠাকুর আমি যাবো।

কোথায়?

বাসায়, কেন তুমি না আমার মত হবে, মেঘ হবে।

হবো তো, কিন্তু ভয় করছে।

শোন ভয় পেলে হবে না, ভয়কে জয় করে এগিয়ে যেতে হবে, যুগে যুগে মানুষ অনেক অসাধ্য কে সাধ্য করেছে।

বলতে বলতে, কিছু এলিয়েন, সাথে নিউটন ও আইনস্টাইন, এসে বলল! হা…. হা….. হা…. হা…. আমরা পেরেছি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলল, কী?

বাতাসের গতি পরিবর্তন করেছি।

সেরিনা বলল, ধন্যবাদ।

তোমাকেও ধন্যবাদ।

আমি যাবো।

না তুমি আরো থাক, ঘুরে ঘুরে সব দেখো।

এখানে কোন প্রাণিদের সংঘর্ষ না হলেও প্রাকৃতিক যে সংঘর্ষ হয়, তা খুব কম, তবে আমরা অন্য গ্রহের বন্ধুরাসহ চেষ্টা করছি তা দূর করতে। সব পৃথিবীর জন্য, পৃথিবীকে সুন্দর ও সুস্থ রাখতে।

সেরিনা বলল, তোমরা কত ভালো, পৃথিবীর জন্য কত কিছু করলে, এখনো করে যাচ্ছো, দেখবে তুমি একদিন এদের মতো হবে, গড়বে সুস্থ সুন্দর পৃথিবী, সেরিনা সবাইকে ধন্যবাদ দেয়, সবাই খুশি হয়।

রবীন্দ্রনাথ বলল, এবার চল, বাই, বলে-

সেরিনা, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে বাতাসে মেঘের আকাশ পাড়ি নিয়ে চলে আসে বেলকনিতে।

বেলকনিতে বসে, রবীন্দ্রনাথকে হাত নেড়ে, টা টা দিচ্ছে,

পেছনে সেরিনার মা বলল, কি কেরে সেরিনা কাকে টা টা দিচ্ছিস।

সেরিনা বলল, না মা এমনি, আনমনা মুখে হাসি দিয়ে বলল, মা তুমি কখন এলে?

এই তো এক্ষুনি, আমি বুঝতেই পারিনি।

মা বলল চল, নাস্তা খাবে।

সেরিনা ওঠে মায়ের হাত ধরে ঘরের ভেতর যেতে যেতে ভাবতে থাকে, রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন ও নিউটনের কথা। প্রতিদিন বিকেল হলে, সেরিনা ঐ বেলকনিতে বসে বসে খোঁজে রবীন্দ্রনাথকে, কখন তাকে নিয়ে যাবে, মেঘের কোলে, যেখানে এক একটা মেঘ এক একটা মানুষ, যেখানে রোদ্দুর হাসে, আছে ভিন গ্রহের বন্ধুরা, আইনস্টাইন ও নিউটনসহ কত কিছু ভাবছে কতদূর, কোথায় সেই মেঘের ইস্টিশন।

আরো পড়ুন: গর্ভধারিণী উপন্যাস রিভিউ

error: Content is protected !!