fbpx

বদরুজ্জামান আলমগীরের কবিতা

কামরুন্নেসা বেগমের সঙ্গে এক সন্ধ্যা

কামরুন্নেসা বেগম সময় নেন- রেলিং ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠেন; তাঁকে একটু ধরে সিঁড়ি ভাঙানোর জন্য আমি হাত বাড়াই, মনে হয় না যে, কারো হাত ধরে উপরে উঠতে তার কোন আপত্তি আছে। তিনি আমার হাত না ধরে একটু স্মিত হাসি দেন- তারপর নিজে নিজেই সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসেন।

খাবার টেবিলে সব খাবারই তিনি কিসের সঙ্গে যেন মিলিয়ে দেখেন- পাবদা মাছে দাগগুলো কেমন একটু বাঁকা, আর শুঁড়ও আছে; ছোটবেলায় শুনচি- এই পাবদা মাছগুলি ব্রহ্মপুত্রের টলটলে পানি থেকে আড়িয়াল খাঁর ঘোলা জলে নাইওর যায়, আবার বাপের বাড়ি ফিরে আসে।

এভাবেই পাবদামাছের শরীরে সাদা আর কালো ডোরাকাটা দাগ পড়ে।

নার্গিস, তুমি লাউ দিয়া মুরগী রান্না করচো উনি এইভাবে তরকারি রান্না করলে খুব পছন্দ করতো, দুই মেয়েরে দুই পাশে বসাইয়া লোকমা তুলে দিতো এমনই করতো উনি- যেইটা বেশি পছন্দের খাবার তা দুই মেয়েরে খাওইয়া নিজে টিপটিপ করে হাসতো।

উনি সময় বেশি পায় নাই।

ছেলেমেয়ে মানুষ হয়ে গিয়েছিল- এক মেয়ে পুরো দস্তুর ডাক্তার, আরেক মেয়ে এমবিএ করে আমেরিকায় থাকে, স্বামী বড় কোম্পানিতে মস্ত অফিসার।

আমার মেয়েদের মধ্যে উনি বিরাজ করে ওদের কথা, মুখের গড়নে উনি আছেন!

চলে যাবার সময় আমারে বলে কী- শোন, বাকি দিনগুলি তুমি ওদের বাবা,
কখনও চোখের পানি ফেলবা না, বিপদে আপদে শক্ত থাকবা- তুমি বাবা, তুমিই মা;

কানবা না, মোকাবেলা করবা!

উনার কথাই সই, আমি কান্দি না, নীপু নীরু দুজনেই কত বড় হইসে এখন- ওরা সচ্ছল,
এই দুনিয়ায় মানইজ্জত নিয়া চলার মত দাঁড়িয়ে গ্যাচে ওরা।

ওদের চেহারায়, কথায়, আচরণে আপনার কত ছবি ভেসে ওঠে, আপনার মত লাগে-
ওদের চোখের গভীরে আপনার চোখ, ওদের মনের পিছনে পদ্মপাতায় আপনার মন আসীন।

ওদের দিকে তাকালেই ইচ্ছা করে আপনার পছন্দের মুরগী লাউ দিয়া রান্না করি-
দুই চোখ ভরে কান্না আসে- ব্রহ্মপুত্র থেকে আড়িয়াল খাঁ গাঙ্গে ডুবসাঁতার,
কাঁদি না।

আমি একটা পাবদা মাছ, পিঠে সাদাকালো ডোরাকাটা দাগ খাবার টেবিলে বসে সাঁতরে যাই। কাঁদি না,

মোকাবেলা করি!

 

কথার গম্বুজ

কথারা গড়ে মেঘের গম্বুজ।

কথা নৃশংসতা নয় – নয় বলাৎকার বা খুনের নেশা যে যথেচ্ছা তাদের ছড়িয়ে দেয়া যায়; কথা হরপ্পা সভায় দেয়াল চিত্রে নৈঃশব্দ্যের পাপড়ি।

মেঘের পছন্দ পাহাড়ের মাথায় ঝরে তার পায়ের নিচে ঢালুর বিন্যাসে ছড়িয়ে পড়া।
কথারা বীজধানের জাত- কথাদের ছড়িয়ে পড়তে বীজতলা লাগে- বীজতলা তৈরি হবার আগ পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করে।

কথারা বোঝে তুমিই তাদের মোক্ষম বীজতলা- তুমি ছাড়া অন্য কোন আঙিনায় তারা কখনো ছড়িয়ে পড়ে না।

কথারা দৃশ্যমানে কলম – তারা আসলে নিবের মুখে লুকিয়ে থাকা তৃষ্ণা- কথারা আল্লার কী কুদরত লাঠির ভিতর শরবত! কথারা অনাগত শিশুর কলরব।

তুমি যতদূরেই যাও – কথারা পিপাসার হেরিটেইজ – কথারা তোমার আনত কলসের নিচে নতজানু, দূরদুরান্ত শহরের গ্রাফিক্সে নোঙর!

তুমি যেতে পারো স্টিল ওয়াটার ওকলাহোমা, কী বাওরের পাড় নেত্রকোণা- দেখো, না-বলা কথার পাগলা ঘোড়া আলগোছে সেখানেও হাজির।

ভয় নেই, যেতে পারো লেইক টিটিকাকা, কী যদি চাও হাইডা টাকায়ামা, অথবা ম্যানারোলা যেখানে খুশি চলে যেও। কথারা তোমাকে খুঁজে বের করবেই- তুমি যে হয়েছো তাদের গর্ভবতী নারীর আচারের বয়াম, গির্জার নৈর্ব্যক্তিক ঘণ্টাধ্বনি- যে বাতাসের অদৃশ্য টানে ভঙ্গুর আখড়া বানায়,আর ঝড়ের মুখে অসহায়ভাবে কাঁপে।

 

ভাতের দানা

থালার একপাশে খানিকটা ব্যঞ্জন; মনে হয়,
ক্ষেতের এককোণায় জবুথবু মুনিশ মৈজুদ্দিন
বিলাতি বাসনে সাদা সাদা ভাতের মোহর
প্লেটে সাজিয়ে রাখা অবহেলার ধন
কেবলই ভোগ্যপণ্য- বার্গার, পাস্তার তুলনায়
আলিশান হোটেলে এসে দ্বিতীয় শ্রেণীর খাবার
ভাত, আহা ভাতের দানা
উঠে এসেছে পাঁচতারা হোটেলের ডাইনিং রুমে
স্নেহ চায় ভাতের দানা, চুড়ির টুংটাং চায় ভাতের দানা
পরিবেশনকারীর অতি সৌজন্যে
থালা থেকে ছলকে মেঝেতে পড়ে যায় ভাতের দানা
বরতনে থাকলে ভাত মাটিতে পড়লে আবর্জনা
বড় দুনিয়ার এমনই সংক্ষিপ্ত কথাসারাৎসার
ধানের থোরে দুধ এলে ক্ষেতের আলের পাশে
বাতাসের প্রশ্রয়ে এমনিই বসে ছিল আমার বাবা

কেউ তোলে না আর ধানের ঘনীভূত দুধ আনমনা-
ট্রেশ হয়, আবর্জনা হয়ে যায় ভাতের দানা।

 

আরো পড়ুন: তমিজ উদ্দীন লোদীর কবিতা

পলিয়ার ওয়াহিদের কবিতা

গল্প লেখার কলাকৌশল

ফলো করুন: সুধাপাঠ সাহিত্য পত্রিকা

 

 

3 thoughts on “বদরুজ্জামান আলমগীরের কবিতা

Comments are closed.

error: Content is protected !!