fbpx

গর্ভধারিণী: বিপ্লব ও উপলব্ধির গল্প- উপন্যাস রিভিউ

গর্ভধারিণী উপন্যাসটি ৩ জন মানব এবং ১ জন মানবীর বিপ্লবের উপাখ্যান নয়, গল্পটি উপলব্ধির। আনন্দ, কল্যাণ, সুদীপ এবং জয়িতা ৪ জন মৌলিক চরিত্রের চিন্তার বৈচিত্র্যতা অথচ চেতনার সম্পৃক্ততা নিয়ে এক সামন্তবাদী সমাজ থেকে সাম্যবাদী পৃথিবীর স্বপ্নের পুঁথিলিপি হলো গর্ভধারিণী। যেখানে একটা সাম্যবাদী সত্ত্বাকে লালন করে এমন এক গর্ভধারিণীকে তুলে ধরা হয়েছে, যার স্পন্দনে জন্ম নিবে অশিক্ষা, লিপ্সা, মিথ্যা, কুসংস্কার মুক্ত একটি নব প্রজন্ম।

সত্যিকার অর্থে দুই চার কথায় গর্ভধারিণীকে তুলে ধরা সম্ভব না। তবুও তারই হ্মুদ্র প্রয়াস। উপন্যাসটির মূল চরিত্রে ভৃমিকা পালন করছেন জয়িতা, সুদীপ, আনন্দ, কল্যাণ। এদের চারজনের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন দর্শন ভিন্ন তবুও যেন তারা একই সুঁতোয় বাধা। এই চারজনের দুঃসাহসী জীবন দর্শনের প্রেক্ষাপটই মূলত এই উপন্যাস।

সত্তরের দশকের শেষর দিকে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়লেও তার পরবর্তী প্রজন্মের এক দল তরুণ-তরুণী এই আন্দোলনের তখনো দেশটাকে শোষন মুক্ত করার স্বপ্ন দেখে।

সুদীপ বিত্তবান পরিবারের সন্তান পুঁজিবাদী মানুষগুলো ভদ্রতার আড়ালে যে নোংরা আর নির্দয় মূর্তি ধারণ করে রাখে সেটা তার বাবা অবনী তালুকদারের মাঝেই খুঁজে পেয়েছিল। তাই বিদ্রোহের আগুন শৈশব থেকেই তাকে তাড়া করত।

কল্যাণ নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধি যারা নিজেদের মধ্যবিত্ত বলার মাঝে একটু স্বস্তি খুঁজে পায়। তাই বিপ্লবের পথে সে তার পরিবারের মুক্তির পথ খুঁজতে চেয়েছিল।

আনন্দের গল্পটা একটু আলাদা। বাবা নকশাল বাড়ি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল শিকড় থেকে। নেতৃত্ব আনন্দকে রক্ত থেকে টানে। আর জয়িতা ছিল নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা মেয়ে। ওর বাবা-মার মনোমালিন্যের কারণে ছোটকাল থেকেই একাকীত্ব ওর ভেতরে মুক্ত ধারা প্রবাহিত করেছে অজান্তেই।

এই চার তরুণ-তরুণীর প্রথম অভিযান প্যাড়াডাইস নামে পতিতালয়ে যেখানে আশেপাশের হাজারো মানুষকে আঁধারে নিমজ্জিত করে আলোর রোশনাইতে সভ্য মানুষের বর্বর যৌন  ক্ষুধার তান্ডব। সেখানে সফলতা ওদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলে। শেষ অভিযানটি ওরা এক মন্ত্রী আর তার ক্ষমতার ভিত্তি একটি বিষেশ এলাকার শীর্ষ অপরাধী নানুভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু এদের এই বিপ্লব জনমনে প্রত্যশিত আলোড়ন করতে ব্যর্থ হয়। পুলিশের তৎপরতা ওদের বাধ্য করে কলকাতা ছেড়ে দূরে আশ্রয় নিতে।

আনন্দের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওরা নেপালের উদ্দেশে পাড়ি জমায়। পথে মৃত্যুহীম ওদের চলার পথ রুদ্ধ করে দেয়। অবশেষে ওরা পাহাড় ঘেরা এক সুবিধা বঞ্চিত গ্রাম তাপাল্যাঙে এসে পৌঁছায়।

তাপাল্যাঙের অশিক্ষা, সংকীর্ণ জীবনধারা সেবার অনুপস্থিতি এই মানুষ গুলোর জীবন দুর্বিসহ করে তলেছে। কিন্তু তারপরও এখানে শাসনের নামে শোষন নেই। এই ব্যাপারটা আনন্দকে নাড়া দেয়। আনন্দ স্বপ্ন দেখে এক শোষনহীন সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার। এই প্রচেষ্টায় আনন্দ গ্রামবাসীকে নের্তৃত্ব দেয়। গ্রামবাসীর সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া এবং সবশেষে সেই গ্রামের সন্তানকে পেটে ধরে জয়িতা বাকী বন্ধুদের চেয়ে এগিয়ে যায় অনেক। নিজেকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। গর্ভধারিণী নামের সার্থকতা এখানেই।

 

ব্যক্তিগত মতামত:

আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট ছিলাম। এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি। কিন্তু কিছু মানুষ কখনো কখনো তার কর্ম দিয়ে মৃত্যুকে ছাড়িয়ে যায়। আনন্দ, কল্যাণ, সুদীপ, জয়িতা চারজন সেই অচেনা পৃথিবীর প্রতিনিধি যারা তাদের আয়ু দিয়ে বাচেঁ না, বাচেঁ কর্ম দিয়ে। কখনো বিপ্লবী হয়ে, কখনো মানবতার উষ্ণ স্পর্শ হয়ে। আবার কখনো গর্ভধারিণী রুপে নতুন নির্মাণের শিল্পকার হয়ে।

রিভিউ লেখক: রুমি আক্তার  

গুডরিডসে উপন্যাসটির রেটিং: গর্ভধারিণী

আরো পড়ুন: করোনা কালের গল্প

error: Content is protected !!