fbpx

ইস্টিশনের রূপা: জাহীদ ইকবালের গল্প

হরিরামপুর রেল ইস্টিশনের সান্নিধ্যেই রূপাদের ঘর। ঘর মানে জংধরা প্রাচীন মালটানা পরিত্যক্ত একটি বগি। বগির চারপাশ জুড়ে জঙ্গলের মতো লতাগুল্ম আর আগাছায় ঠাসা। তার নিচেই তাদের নুন-আগুনের ঘর-সংসার। সংসারে রূপা ছাড়াও তার তিন বছরের অনুজ আরও দুটো যমজ বোন আছে। নানি আছে; আছে একটা মাদি কুকুর। দুটি ছিল একটি ট্রেনের নিচে কাটা পড়েছে। বলা যায় এই কুকুরটাই তাদের একমাত্র সঙ্গী। একটা সময় তারা কুকুরটিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ত। এখন তারা ডাঙর হয়েছে। তাদের শয্যাও পৃথক হয়েছে। কুকুরটি বর্তমানে দরজার কাছে ঘুমায়। দরজা বলতে চটের আচ্ছাদন। আচ্ছাদন  উঠিয়ে কুর্ণিশের ভঙ্গিতে কুঁজো হয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হয়।

কুকুরটি দিনের অধিকাংশ সময় তাদেরকেই সঙ্গ দেয়। তিনবোন ট্রেনে উঠলে, তারা ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের জন্য প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করে। আসতে একটু বিলম্ব হলেই ঘরমুখো হয়। নানির বকা আর তাড়া খেয়ে পুনরায় সে ইস্টিশনের পথ ধরে। অপেক্ষা করে রূপাদের জন্য। রূপারা বেশিদূর যায় না। দুটি ইস্টিশন পরেই কালীগঞ্জ রেলইস্টিশন। সেখানেই তারা নেমে পড়ে। ফিরতি ট্রেন না আসা পর্যন্ত কালিগঞ্জ রেল ইস্টিশনেই গান করে। ততক্ষণ না খেয়ে কুকুরটি ইস্টিশনের প্ল্যাটফর্মেই বসে থাকে। ভুলেও নানির ভয়ে ঘরমুখো হয় না। স্বদেশি বলে সে ট্রেনে চড়তে পারে না অথচ বিদেশী কুকুরগুলো এদেশে তাদের প্রভুদের কোলে চড়ে কত আরাম-আয়েশেই না ট্রেন জার্নি করে আর তারা হতভাগারা সমস্ত জীবন পড়ে থাকে ইস্টিশনের প্ল্যাটফর্মে।

রূপার গায়ের রঙ ময়লা হতে পারে; পরিধানের কাপড় ছেঁড়া আর অপরিচ্ছন্ন হতে পারে; কিন্তু তার চেহারার গড়ন হয়েছে একছের সুন্দর। তার চোখের দিকে তাকালে চোখ দুটো যেন গল্প জুড়ে দেয়; হাসে, কথা কয়। মানুষের চোখের হাসি সবাই দেখতে পায় না। দেখতে পায় বিশেষ কিছু মানুষ। রূপার বিশেষ কোনো মানুষ নেই। তার চোখ দুটো অনেকটা ডাগর কালো। চোখে সে কোনোদিন কাজল পরে না। পরলেও সে কথা তার স্মরণে নাই। তবুও তার চোখ দুটো যেন ভরা কাজলদানি। মজার কথা হচ্ছে রূপার কাছে তার এই চোখ দুটো একদমই অপছন্দ। তার বাঁ চোখের নিচে একটা চাঁদের মতো কাটা দাগ আছে। দাগটা তাকে প্রায়শই বিব্রত করে।

‘ইশরে! আর এট্টু হলিই তোর চোখটা নষ্ট হয়ে যাতো! কি অইছিল রে রূপা?’

‘চোখের নিচনে কালো দাগ ক্যান?’

‘রাইতে কি তোর ঘুম অয় না? বয়স তো এহনও সিরাম এট্টা অয় নাই। এর আগেই চোহের এ কী হাল অরিছিস দ্যাকদিনি?’

রূপা তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দরদ উথলে ওঠা কথার কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না। চোখ নাড়িয়ে অথবা লাজুক একটা হাসি উড়িয়ে তাদের পাশ কেটে চলে যায়।

রূপা জলের নিচে সপ্তাহে দু’একদিন যায় কি-না সন্দেহ। স্নানে তার বরাবরই চরম অনীহা। জলে যেন কুমির বাস করে অথবা জল তাকে কামড়ে দেবে। সে ভুলেও মল্লিকবাড়ির পুকুরের পাশ দিয়ে হাঁটে না। কখনো গা ডলে-কচলেও সাবান দেয় না। শীতের মাসে দু’চার দিন হাঁসের মতো জলে ডুব দেয়। পাখনা ঝারে। শীতে কাঁপে। তা-ও নানির চিল্লাচিল্লি আর বকাঝকার ম্যালা পরে। রূপার শরীর দিয়ে বুড়বুড় করে তেলচিটচিটে ঘামের ঘ্রাণ বেরোয়। সালোয়ার-কামিজ একবার গায়ে চড়লে ওগুলো আর খসানোর কোনো নাম থাকে না। দিনকে দিন গতরেই সেঁটে থাকে। হাত-পা, মুখে কালশিটে চাবুকের দাগের মতো ময়লা দাগ। দাগগুলো কাছে এলে বলিরেখার মতো দৃশ্যমান হয়। দূর থেকে তেমন একটা নজরে আসে না। মন্দ মানুষেরা এসব দেখে না। তাদের চোখ খোঁজে শরীরের পাহাড়পর্বত, উঁচু-নিচু।

রূপা কারও নজরেও পড়তে চায় না। সে আরও ডাঙর হতে চায়। মায়ের মতো অল্পবয়সে জীবনটা নষ্ট করতে চায় না। এমনিতেই ইস্টিশনে পড়ে থাকা মেয়েদের জীবনে বিয়ে-শাদির কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না। পারলে যমজ বোন দুটিকে আগেভাগে বিয়ে দেবে। পরে সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। তাছাড়া পছন্দ বলতে যা বোঝায়, তেমন কোনো পুরুষ তার চোখে পড়েনি। এ টুকুন বয়সে সে যাদের দেখেছে, কাউকেই তার পছন্দ হয়নি। সবাই তার শরীরটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়, পছন্দ করে। ইস্টিশনে নানান বয়সের নানান কিসিমে’র মানুষের সঙ্গ সে পেয়েছে। কিন্তু একটি জায়গায় এসে সে আবিষ্কার করেছে সব বয়সের সব পুরুষের চরিত্র অনেকটা একই রকম। পৃথিবীর সমস্ত নারীও এই একটি জায়গায় এসে স্থবির হয়ে যায়। কিন্তু কেন? এই প্রশ্ন সে আজও কাউকে করতে পারেনি। নিজের ভেতরে পুঁতে রেখেছে। নানিও এই কিসিমের ম্যালা কথা বলে বারংবার তাকে হুঁশিয়ার করেছে। একবার জীবনের নষ্ট খানাখন্দে পড়ে গেলে, সেখান থেকে উঠে আসা কঠিন সাধ্য ব্যাপার।

রূপা পুরুষের চোখের ভাষা দ্রুতই পড়তে পারে। তাদের কথার ধরণ এবং উদ্দেশ্য বুঝতে পারে। এইটুকু বুঝতে পারে বলেই সে এখনও হরিরামপুর রেল ইস্টিশনে টিকে আছে বা তার পায়ের তলায় এখনও মাটি আছে, চোরাবালির মতো সরে যায়নি। সে একটু স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে চায়। অবিশ্যি তার মা-ও এভাবে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। জীবনের কাছে হেরে গেছে। তবে সে কোনো ভ্রান্তপথ বেঁচে নেয়নি। ইচ্ছেমৃত্যু তাকে ওপারের তারাদের সঙ্গে শামিল করেছে।

তার দ্বিখণ্ডিত হওয়া দু’টুকরো লাশ অনেক বেলা পর্যন্ত রেললাইনের ভেতরে এবং বাইরে পড়েছিল। সকালে ঘুম ভেঙে তারা শোরগোল শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখে তাদের মা ট্রেনে কাটা পড়েছে। তাদের তিনবোনের কান্নায় হরিরামপুরবাসীর চোখেও সেদিন অশ্রুর ঢল নেমে ছিল। নানি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। তার কোনো হঁশ ছিল না। কিছুদিন তাদের ভিক্ষায় নামতে হয়নি। অনেকেই ঘরে এসে খাবার, টাকাপয়সা পৌঁছে দিয়ে গেছে। ক’দিন এলাকাবাসীর মুখে মোমেনার অনেক তারিফ শোনা গেছে। সে আর দু’দশটা মেয়েদের মতো ছিল না। অনেক ধৈর্য আর বড় ভালো মেয়ে ছিল। টাকার বিনিময়ে নিজের সন্মান সে নিলামে তোলেনি। স্বামীর সব জুলুম-অত্যাচার মুখবুজে সহ্য করেও কোনোদিন স্বামীকে ছেড়ে যায়নি। যারা কখনো ছেড়ে যায় না, তাদেরকেই যেন সবাই ছেড়ে চলে যায়। এটা-ই নিয়তি। এটা-ই যেন চরম বাস্তবতা।

রূপা ন’বছর বয়স থেকেই তার মায়ের সঙ্গে থালা বাজিয়ে গান গেয়ে ভিক্ষা করে। মোমেনার কন্ঠ ছিল সুরেলা। তার গান শুনে রাস্তার মধ্যেই লোকজন দাঁড়িয়ে যেত। গানের তারিফ করত। সেই সময় মানুষ গান শুনে প্রচুর টাকাপয়সা ছুড়ে দিত। থালায় ঝুনঝুন শব্দ হতো। বৃষ্টির মতো পয়সা পড়ত। দিন বদলেছে। দানখয়রাতে মানুষের মন উঠে গেছে। এখন তারা তিনবোন গান করে। সবাই তাদের শরীরের দিকে তেরচা চোখে তাকায়। সারা শরীরে পছন্দসই কিছু একটা তালাশ করে। কেউ কেউ যুবতী মেয়ে বলে ভিক্ষা দিতে ইতস্ততবোধ করে। কাম করে খেতে বলে। কী কাম করবে তারা! বাসার কাম? এর চেয়ে নটি পাড়ায় গিয়ে নাম লেখালে তারা বেশী টাকা পাবে। গার্মেন্টস যদিও কিছুটা ভালো তবে মফস্বল শহর বলে এই হরিরামপুরে এখনও কোনো গার্মেন্টস গড়ে ওঠেনি।

ইস্টিশনটা দীর্ঘকাল সংস্কারহীন পড়ে আছে। জোড়াতালি দিয়ে কোনোভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। তেমন কোনো সংস্করণ হচ্ছে না। ট্রেনেও আগের মতো তেমন একটা যাত্রী নেই। অথচ একটা সময় মানুষ ট্রেনের বিকল্প কিছু ভাবতে পারত না। দূরপাল্লার যাত্রীদের একমাত্র বাহনই ছিল লঞ্চ আর ট্রেন। অনেক ছোটবেলা থেকে রূপা নানি-দাদির মুখ থেকে শুনে আসছে ট্রেন উঠে যাবে। সরকার দেশে ট্রেন রাখবে না। ট্রেনে শুধু লোকসান আর লোকসান। এ কথা শুনতে শুনতে সে বড় হয়েছে। কিন্তু ট্রেন ঠিকই আছে শুধু ঘাপটি মেরে পড়ে থাকা কালো বেড়ালেরা পালিয়েছে। আবারও ট্রেনের সুদিন আসছে। সেদিন হয়ত তারা এখানে থাকবে না। সরকার তাদের উচ্ছেদ করবে। তারা জলশ্যাওলার মতো ভাসতে ভাসতে কোথায় নিরুদ্দেশ হবে।

রূপার একটি পা জন্ম থেকেই বাঁকা। সে খুঁড়িয়ে পা টেনেহিঁচড়ে হাঁটে। তার হাঁটতে ভালো লাগে না। লজ্জা করে। কিন্তু তার জন্মই হয়েছে হাঁটার জন্য, না হেঁটে উপায় কী! বসে বসে ভিক্ষার দিন উঠে গেছে। এখন প্রচুর ঘাম ঝরাতে হয়, হাঁটতে হয়; গলা ছেড়ে ভাঙা গলায় চিৎকার করে গান গাইতে হয়। তবেই দু’এক টাকা জোটে। ইস্টিশনে এখন আর মানুষ ভিক্ষা দিতে চায় না। সবাই যে যার গন্তব্যে ফেরার জন্য ব্যস্ত থাকে। ডানে-বামে কিংবা তাদের দিকে তাকাবার কারওর ফুরসত নেই। যদিও কেউ তাকায়, তাদের নয়ন থাকে নষ্ট। সেই নষ্ট নয়নে তারা তাদের দুর্দিন দেখে না; দেখে সর্বনাশ। দেখে তাদের ভিতরের নোঙারামিগুলো।

রূপার বাবার একাধিক বিয়ে। সে নিরুদ্দেশ। পালিয়ে বেড়ায়। তাদের ঘরেও সন্তাদি আছে। রূপাদের কোনো খবর-তালাশ নেয় না। রূপারা তার নানির কাছেই বেড়ে উঠেছে। নানিও ভিক্ষুক। তবে এখন আর তার হাঁটার শক্তি নেই। অসুখ-বিসুখ আর কিছুটা বার্ধক্যজনিত কারণে সে প্রায়শই বিছানায় পড়ে থাকে। চুলোয় তেমন একটা হাঁড়ি চড়ে না। রূপা গান গেয়ে শুধু টাকা পায় না,ভাত-শালুনও পায়। চেয়েচিন্তে তাদের দিন মন্দ যায় না। কিন্তু রাত্তির হলেই বিষপিঁপড়ার মতো কিছু গু খাওয়া শুয়োর তাদের রাত্তির নিদ্রা হারাম করে দেয়। কুকুরের মতো তিনবোনের পা ধরে টানাহেঁচড়া করে। ফিসফিস করে পঞ্চাশ টাকার লোভ দেখায়। কুকুর দুটি রাতভর ঘেউ ঘেউ করে। নানি তাদের তিনবোনকে মুরগির বাচ্চার মতো শক্ত করে বুকের মধ্যে আগলে রাখে। খিস্তিখেউড় করে করে বেচারির প্রায় রাত্তিরই ভোর হয়। তবুও তিনি আশঙ্কায় থাকেন, নাতনি তিনটির জীবনে কখন কী ঘটে যায়! একবার তারা তিনবোন এক দালালের খপ্পড়ে পড়েছিল। ইস্টিশনের রেখার জন্য সে যাত্রায় তারা বেঁচে গেছে। রেখা মানুষ হিসেবে সৃষ্টির সেরা। কিন্তু কর্মকাণ্ডের দিক দিয়ে মন্দ। মন্দ বলেই সে মন্দ মানুষটাকে চিনতে পেরেছিল।

সেই থেকে রেখাকে নানি প্রশ্রয় দেয়। রেখাও নানিকে খুব পেয়ে বসে। মাঝেমধ্যে হুটহাট করে সে তার কুটুম্ব নিয়ে হাজির হয়। রূপারা ঘরে থাকে না। নানিকে জোর করে পান খেতে ইস্টিশনের দোকানে ভেজায়। সেই ফুসরতে রেখা কুটুম্বদের আপ্যায়নে নিজেকে উৎসর্গ করে।

 

০২.

হরিরামপুর রেল ইস্টিশনে দু’জন নয়া ভিক্ষুকের আবির্ভাব ঘটেছে। বলা যায় অনেকটা কাকতালীয়ভাবে তারা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। দখল করেছে রূপাদের নির্ধারিত বসার স্থানটি। যে স্থানে বসে প্রতিদিন তারা তিনবোন গান করে। এই জায়গাটিতে যাত্রীরা জটলা করে বেশি। ভিক্ষুক দু’জন সম্পর্কে মা-ছেলে। ছেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তার এক চোখ জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। বয়স এক কুড়ি দুই বছর। পাটখড়ির মতো লম্বা গড়ণ। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। মাথাভর্তি বাউলদের মতো ঝাঁকড়া চুল। মা ছেলে একসঙ্গে ভিক্ষা করে। তার মা-ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। তার দু-চোখই অন্ধ। সে জন্মান্ধ। মা তবলার মতো থালা বাজায়, ছেলে গলা ছেড়ে গান গায়।

দূরের যাত্রীরা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করে। ফাঁক-ফোকরে তাদের গান শোনে। তারা লোকজন ভালোই জমিয়েছে। এর কারণ হচ্ছে ইস্টিশনে তারা দু’জনেই নতুন। তাছাড়া এই মায়ালাগা গান, পাগল করা সুর রেলইস্টিশনের লোকজন আগে কখনো শোনেনি। সে গলা ছেড়ে পর্যায়ক্রমে পরপর তিনটা গান গেয়ে বিরতি নেয়। সেই মুহূর্তে লোকজন বৃষ্টির মতো তাদের থালায় টাকা-পয়সা ফেলে। টাকা গুনতে গুনতে ছেলেটা বিপুল উৎসাহে পুনরায় গলা ছেড়ে গান ধরে। এটাও নতুন গান। পর্যায়ক্রমে আরও তিনটি গান উপস্থাপন করে সে থেমে যায়। গানের কথাগুলো আধ্যাত্মিক। মরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নরোম করে দেয় মানুষের অন্তর। মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে দ্রুত পকেট হাতড়ায়।

সেই মুহূর্তে মতির মা ছোগরা খাতুন মুখ খোলে, ‘দ্যান দ্যান সাহেবেরা, আমাগো কিছু দিয়া যান। আমরা অন্ধ অচল মানুষ। আমরা আয়রোজগার করতি পারি না। দ্যান দ্যান দুই এট্টা টাহা দিয়া যান!’

যারা একবার দিয়েছে তারা আর দ্বিতীয়বার টাকা দেয় না। নতুন যদি কেউ আসে তারা দু’এক টাকা দেয়। প্রথম পর্বের মতো টাকা ওঠে না। ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে থেকে রূপা সুক্ষ্ণভাবে বিষয়টি আবিষ্কার করে। তার ঝুলিতে নতুন কিছু অভিজ্ঞতাও জমা পড়ে।  পাশাপাশি সুন্দর গানের জন্য ভিক্ষুক ছেলেটাকে তার মনে ধরে। তাকে সে মনের সিংহাসনে একটু জায়গা দেয় এবং তাৎক্ষণিক ছেলেটার হাতে সে পাঁচ টাকার একটি কড়কড়ে নোট গুঁজে দেয়। সবাই যেখানে দিয়েছে এক টাকা দু’টাকা, সেখানে সে একাই দিয়েছে পাঁচ টাকা। ভালো লাগার পরিমাণটা বোধহয় মানুষ এভাবেই জানান দেয়। ট্রেন ছেড়ে দিতেই ইস্টিশন ফাঁকা হয়ে যায়। রূপা তাদের সামনে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে।

‘আফনে গো বাড়ি কোহানে?

‘বাড়িঘর পাবো কোহানে! এই ইস্টিশানই আমাগো বাড়িঘর।’

ছেলেটা জবাব দিল না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জবাব দিল তার অন্ধ মা।

‘এর আগে কোহানে ছেলেন?’

‘সেই জায়গা তো নদীর হা_এর মদ্দি হাবুডুবু খাইতিছে।’

ছেলেটা জবাব দিল।

‘আফনার গান কিন্তুক আমার মনে ধরিছে! আমিও গান গাই। আমারে গান শিহাইছে আমার মায়।’

‘আমারে শিহাইছে আব্বায়। আব্বায় গানের দলের বয়াতি ছেলো। হ্যায়ই আমার গানের ওস্তাদ।’

‘আমারে আফনি গান শিহাবেন?’

‘মায় কইলে শিহাবো।

রূপা সময় নষ্ট করে না। দ্রুত ছেলেটার মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে।  মা’র পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মা, আমি গান শিকতি চাই।’

‘গান তো চাইলেই শেহা যায় না মা। গান অইলো গিয়া সাধনার জিনিস। এইডা ভিতার দিয়া আসতি অয়। তোমার ম্যালা সাধনা অরা লাগবে। তুমি কি সাধনা অরতি পারবা?’

‘বাঁচতি অইলি তো পারতি অবে।’

‘তাইলি কিছুদিন সবুর অরা লাগবে। তা মা তোমরা থাহো কোহানে?’

‘এই রেললাইনের পাশেই থাহি। ওই যে আমাগো ঘর দেহা যায়।’

রূপা আঙুল উঁচিয়ে অদূরে নিজেদের ঘর দেখায়।

‘আমি দেহি না। আমি তো…।’

‘মা, আমি দেহিচি।’

‘মতি, দেইহে রাখ। একদিন আমরা সময় কইরে মাইয়াডার বাসায় যাবো নে।’

‘আফনেরা আমাগো বাসায় এহোনি লন।’

‘না রে মা, আইজ না অন্য একদিন যাবোনে। আল্লায় তোমারে জানি ম্যালা দিন বাঁচাইয়া রাহে!’

রূপার মাথায় মতির মা আলতো করে মমতার পরশ বুলিয়ে দেয়। রূপা ভালো লাগায় গলে যায়। কিছুটা লজ্জাও পায়। সেই সঙ্গে মতিও। মতির একটিমাত্র নয়ন। সেই নয়ন রূপার সমস্ত শরীরে ছোটাছুটি করে।  রূপা টের পেয়ে লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। তার খুব ভালো লাগে। জীবনের এই প্রথম কোনো পুরুষের চাহনি তার মনে অদ্ভুত এক শিহরণ তুলেছে।

রূপা চলে যায় তবুও মতি তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। রূপাও বারংবার পেছন ফিরে তাকায়। মতিকে দেখে। তার চোখমুখ খুশিতে রাঙা হয়। সেদিন সারাদিন রূপা আর ইস্টিশনে গান করেনি। সমস্তদিন একটু পরপর তাদের কাছে ছুটে এসেছে। সুখদুঃখের গল্প করেছে।

‘ইস্টিশনে ম্যালা হারামি মশা থাহে। মশা মারতে মারতে বেহান অবেনে! রাইতে আর ঘুমান লাগবে না নে!’

বারংবার এটা-ওটা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রূপা একপ্রকার মা ছেলেকে এবং নানিকে রাজি করিয়ে, সন্ধ্যার আগেভাগেই তাদের ঘরে তুলেছে।

 

০৩.

হরিরামপুর ইস্টিশনের পঞ্চাশোর্ধ টিকিট মাষ্টার আফতাব উদ্দিন সাহেবের নজর ভালো না। লোকটার চোখে চোখ পড়লেই প্রায়ই রূপার গান শোনার জন্য তার টিকিক কাউন্টারে আহ্বান করে। সে সব সময়ই তাকে তার ব্যস্ততা দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আজ আর সে তাকে না করতে পারে না। নিতান্তই অনিচ্ছায় মণি, মুক্তাকে সঙ্গে করে তার কাউন্টারে প্রবেশ করে। সে মতি বয়াতির মতো পরপর তিনটি গান করে বুকভরে নিশ্বাস নেয়।

‘রূপা, তুই আমাকে একদম মাথ করে দিলি! তুই তো একটা খাঁটি হীরা! তোর কন্ঠে তো সুন্দর বনের খাঁটি মধু আছে। চাক চাক মধু। আছে জাদুও।’

টিকিট মাষ্টার আফতাব উদ্দিন সাহেবের তারিফে রূপা লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে সে একটি দশ টাকার নোট তার হাতে গুঁজে দেয় ‘মাঝে-মধ্যে আসিস। তোর কন্ঠের মধু খাওয়াইয়া যাইস। দেখিস একদিন তুই অনেক বড় শিল্পী হবি। সারাদেশে তোর অনেক নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়বে। আমিই তোর গানের সিডি বের করে দেব। দেয়ালে দেয়ালে তোর বড় বড় পোষ্টার থাকবে। সবাই তোকে দেখবে। দেখিস না সালমার এখন কত নাম-ডাক। টাকাপয়সা। তোর মতো সালমাও একদিন এই রেল ইস্টিশনে পড়ে থাকত। আমাকে রোজ গান শোনা তো। এখন তার অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। সে প্লেনে চড়ে দেশ-বিদেশে একেরপর এক এস্টেজ প্রোগ্রাম করে বেড়ায়। তোকেও আমি সেই ব্যবস্থা করে দেব। কী তুই মাঝে-মধ্যে আসবি তো!’

রূপা মাথা উঁচু-নিচু করে। কথাগুলো শুনে তার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। গান গরম হয়ে যায়। ভয়ে তার পা চলে না। অকস্মাৎ টিকিট মাষ্টার রূপার পিঠে হাত রাখে। রূপা চমকে ওঠে। পরক্ষণে দু’বোনকে নিয়ে দ্রুত টিকিট কাউন্টার থেকে সে এক প্রকার দৌড়ে পালায়।

চৈত্রের মধ্যদুপুর। শেষ যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গেছে ট্রেন। ইস্টিশন এখন প্রায় অনেকটা-ই ফাঁকা। প্ল্যাটফর্মের টিনের চালায় যেন রোদ জ্বলন্ত আগুন ঢালছে। শরীর, চোখমুখ পুড়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে প্ল্যাটফর্মে তাদের নেড়িকুকুরটি আর তারা তিনবোন ছাড়া তেমন কেউ নেই। এখনও রূপার বুক ধকধক করছে। বুড়োটা তাকে প্রায় পটিয়েই ফেলেছিল। মণি, মুক্তা সাথে না থাকলে বোধহয় বুড়ো খাটাশটা তাকে আর একটু হলেই পেছন থেকে জড়িয়ে ধরত। অলরেডি পিঠে সে হাতও রেখেছিল। খবিশটা পটাতেও পারে! এত ক্ষমতা এরা কোথায় পায়! সব পুরুষকে তার একই কিসিমের মনে হয়। আচ্ছা মতি কেমন! মতিও কি এইসব পুরুষদের মধ্যে পড়ে! পড়ার কোনো  প্রশ্নই ওঠে না! মতি অন্যরকম পুরুষ। তা না হলে তাকে তার এত ভালো লাগবে কেন! মতি শিল্পী। শিল্পীরা মন্দ হতে পারে না। শিল্পীরা সাধক। সাধকরা মহাপুরুষদের মতো হয়! তারা অন্যসব পুরুষদের মতো নয়। এই বিশ্বাসে রূপার বুকে মৌচাকের মতো মতি নামের ভালোবাসা বাসা বাঁধে।

 

০৪.

‘রূপা সিনেমা দ্যাকপি? হলে জটিল এট্টা সিনেমা লাগাইছে!’

‘তুই দেহাবি কাল্লু?’

‘তুই দ্যাকতি চাইলি দেহাবো!’

‘তুই এইডা ভাবলি কিরাম কইরে? তোর সাথে আমি সিনেমা দেকতি যাবো!’

‘তা যাবি ক্যান? এহন তো তোর সিনেমার হীরো ঘরের মদ্দিই থাহে। আমাগো কি এহন আর বেইল আছে?’

‘তোগো বেইল ছেলো ই-বা কোনদিন?’

‘ছেলোরে রূপা ছেলো। ভিনদেশি কাউয়া যেদিন তলা ফুডা কইরে উড়াল দেবে, সেইদিন আবারও আমাগো বেইল থাকপে!’

‘মতি তোগো মতোন না। মতি আলাদা কিসিমের মানুষ। ভাব জগতের মানুষ। সারাদিনই সে ভাবের মদ্দি ডুব দিয়া থাহে। ফাও চিন্তা অরার হ্যার টাইম কই!’

‘যারা কামের মানুষ, তারা কামের টাইম ঠিকই বানাইয়া লয়!’

‘কী কইলি কালু, বুঝদি পারলাম না!’

‘এতো বুইঝে কি অরবি? তোর দেহি এট্টা ময়না দেহা যায়!’

রূপার ভ্রু কুঁচকে চোখ কপালে ওঠে, ‘মানে?’

সতের বছর বয়েসি কালু তার পান খাওয়া তরমুজের বিচির মতো কালো দাঁত বের করে হাসে। হাসতে হাসতে যেন গড়িয়ে পড়ে ‘তুই  ময়না পাহি চিনলি না!’

কালুর পাশ থেকে তার বন্ধু বশির দাঁত কেলিয়ে হাসে।

বোকা গলায় রূপা মাথা ঝাকায়, ‘না।’

‘ওই দ্যাক তোর ময়না পাহি চাইয়া রইছে!’

কালু দু’গজ দূর থেকে সরাসরি রূপার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়। রূপা বোকা গলায় ঠোঁট চালায়  ‘আমার গায়ে আবার ময়নাপাহি আসফে কোহান দিয়া!’

‘তোর গাছে তো সপ সোমায়ই দুইডা ময়না পাহি বইসে থাহে!

‘কাল্লু, তুই কিন্তুক জমমের খারাপ অইছিস!’

বলে রূপা কালুকে ধাওয়া করে। গালি দেয় ‘তুই দাঁড়া কাল্লুর বাচ্চা কাল্লু। হারামির বাচ্চা হারামি। লুইচ্চার বাচ্চা লুইচ্চা।’

কাল্লু রেললাইনের ওপর দিয়ে দক্ষিণে দৌঁড়ায়। পেছনে রূপাও সমানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়ায়। এক সময় সে হুট করে দাঁড়িয়ে যায়। কারণ ওই দিকে গাঁজাখোরদের আড্ডা বসে। ওই দিকটায় সে কখনো ভুলেও যায়নি। নানির কড়া নিষেধ আছে। রূপা ফিরে আসে। ততক্ষণে বিকেলের সূর্য মরে একদম মেঘের আড়ালে হেলে পড়েছে।

 

০৫.

মতিরা কোথাও বেশিদিন থিতু হয় না। হতে পারে না। তাদের শিকড় মাটির কোনো গহীনতলদেশ স্পর্শ করতে পারে না। তার আগেই উঠে যায়। নিজেরাই শিকড় ধরে টান মেরে উপড়ে ফেলে। রূপার গলায় তার প্রিয় সবগুলো গান সার্থকভাবে তুলে দেওয়ার আগেই তাদের চলে যেতে হয়। মতিরা চলে গেছে। প্রায় পাঁচ মাস তারা রূপাদের পরিবারে থিতু হয়েছিল। রূপা হুবহু মতির গাওয়া পাঁচটি গান তার কন্ঠে সার্থকভাবে তুলে নিতে সক্ষম হয়েছিল। যে গানগুলো মতি দরদ দিয়ে গলা ছেড়ে গাইত, তার শুধু একটি গান গলায় তোলা বাকি থাকতেই রূপার বমি বমি ভাব প্রকট হয়ে ওঠে। রূপাই বিষয়টি মতিকে অবগত করে। কিন্তু মতি কথাটা তেমন একটা গা করে না। চুপ থাকে। অভিমানে এই চুপেই চুপ হয়ে যায় রূপা। কিছুদিন পর কোনো এক ভোরে সে আবিষ্কার করে, মা ছেলে দু’জনের কেউই নাই। তারা তাদের বাক্সপেট্টা নিয়ে উড়াল দিয়েছে।

রূপা তাদের কোথাও খুঁজতে বাদ রাখেনি। তাদের বিয়ের কথাবার্তা অনেকটাই পাকাপোক্ত হয়েছিল। শুধু বাকি ছিল দিন তারিখ। মতি এবং মতির মা’র তেমন একটা চাওয়া-পাওয়ার কিছু ছিল না। মতি ঘরজামাই থাকবে। তার মা তার সঙ্গেই থাকবে। রূপা এবং তার নানিরও কোনো দ্বিমত ছিল না। তাহলে মতিরা তার এভাবে সর্বনাশ করে পালিয়ে যাবে কেন! রূপা ভাবতে পারে না। পৃথিবীর কোনো একজন পুরুষকে সে প্রথম বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। তার সেই বিশ্বাসেও মড়ক ধরল! তার হাত পা সমস্ত শরীর অনেক ভারী লাগছে। উঠে দাঁড়াবার মতো কোনো শক্তি পাচ্ছে না। শক্তি পেলে সে আর এই অচল রেলের নিচে পড়ে থাকবে না। মা’য়ের মতো শুয়ে পড়বে সচল ট্রেনের নিচে। কুমারী মা হওয়ার আদৌ কোনো ইচ্ছে তার নেই। ট্রেনের নিচে শুয়ে পড়ার আগে মতির জন্য সে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবে।

 

০৬.

মণি, মুক্তা ভীষণ লাজুক। রূপাকে ছাড়া তারা অচল। কোথাও এক পা ফেলতে পারে না। ওড়নাটা পর্যন্ত ঠিকঠাকভাবে শরীরে রাখে না। সারাক্ষণ ধমকের উপরেই রাখতে হয়। সামান্য কারণে অকারণে হাসে। সেই হাসি যেন তাদের থামে না!  হাসতে হাসতে তারা একজন আরেকজনের ওপর গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এখন কে কাকে ধমক দেবে! শাসন করবে! ক’দিন ধরে সে নিজেই জ্বরে বিছানা কামড়ে ধরে পড়ে আছে। সেই সকালে দুবোন বেরিয়েছে, এখন প্রায় সন্ধ্যা। ফেরার কোনো নাম-নিশানা নাই। বকুল দুপুরে দেখেছে দু’বোনকে সিনেমা হলে ঢুকতে। সঙ্গে কাল্লু আর বশির ছিল। নানির খিস্তিখেউড় আর চিল্লাচিল্লি চরমে উঠেছে। তার মুখ এক মুহূর্তের জন্যেও বিরাম নাই ‘চেনা নাই জানা নাই রাস্তায় নাঙ এট্টা পাইছে আর অমনি ঘরে লইয়া আইছে। বিয়ার আগেই প্যাডে বাচ্চা একখান সান্দাইছে…আর দুই মাগির তো নয়া গাঙে জোয়ার ওডছে। প্যাডে ভাত নাই নাঙেগো সাথে সিনেমা ঠাফাইয়া বেড়াইতিচে…ও মাবুদ, তুমি আমারে সাত আসমানে উডাইয়া ন্যাও…।’

মণি-মুক্তা ফেরেনি। ওরা দালালের খপ্পড়ে পড়েছে। কর্মটি করেছে কাল্লু আর বশিরের যোগসাজশে। রাতভর রূপা দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। রূপার নানি কখন যে মরে কাঠ হয়ে পড়ে আছে, রূপা একটুও টের পায়নি। ভোরের দিকে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। জ্বরে তার সমস্ত শরীর পুড়ে যাচ্ছে। তবুও নানিকে হারানোর শোকে সে চিৎকার করে অসহায়দের মতো কাঁদছে। নানি এতদিন মুরগির বাচ্চার মতো তাদের তিন বোনকে আগলে রেখেছিল। এখন তাদেরকে কে আগলে রাখবে! শাসণ, বকাঝকা, গালমন্দ করবে!

খবর পেয়ে ইস্টিশন থেকে অনেকেই ছুটে এসেছে। এসেছে ইস্টিশনের টিকিট মাষ্টার আফতাব উদ্দিন।  লাশ দাফন-কাফনের সমস্ত ব্যবস্থা সে-ই  করেছে। জ্বরের ওষুধ কিনে দিয়েছে রূপাকে। ওষুধ খাওয়ার পরও শরীর থেকে তার জ্বর নামছে না। জ্বরে তার সমস্ত শরীর পুড়ে যাচ্ছে। রাত খুব একটা হয়নি। সে বেহুঁশের মতো বিছানায় পড়ে আছে। উল্টাপাল্টা বকছে। এর ভেতরে বেসবুর মতি কাঁথার ভেতরে ঢুকে দু’হাতে তার সুডৌল বক্ষবিতান আটাময়দার মতো সমানে কচলে যাচ্ছে। জ্বরে তার শরীর থেকে ভাঁপা পিঠার মতো ভাঁপ বেরুচ্ছে। সে কঁকিয়ে উঠছে প্রচণ্ড ব্যথায় । তবুও নিষিদ্ধ সুখের ব্যথায় মতিকে তার বাঁধা দিতে ইচ্ছে করছে না।

মতি ফিরে এসেছে জেনে তার ভালো লাগছে। কিন্তু মতি মিয়া তো এত ভয়ঙ্কর হিংস্র আর অসবুর না। সে একটা আস্তা ভেজা বেড়াল। তার স্বভাবে জোরজুলুম নেই। বিষের মতো স্তনযুগল সে যেন কচলে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। তাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে মাটির সঙ্গে পিষে ফেলছে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। অকস্মাৎ রূপা চোখ খোলে। অন্ধকারে হাতড়ে সে একজন পেটমোটা পুরুষকে আবিষ্কার করে। মুহূর্তে চিনেও ফেলে তার অবয়ব। এটা ইস্টিশনের বুইড়া খাটাশ টিকিট মাষ্টার ছাড়া আর কেউ নয়। কিন্তু রূপা তার শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও খবিশটার দানবীয় শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠে না। সে ‘নানি! নানি!’ চিৎকার আরম্ভ করে অথচ তার গলা থেকে কোনো শব্দ বেরোয় না…।

রাত্রি খুব একটা হয়নি। তখনও বগির বাইরে কুকুরটা  সমানে গলা ফাটিয়ে ডেকে চলেছে।

 

আরো পড়ুন: জাহীদ ইকবালের গল্প- দুধবোন

error: Content is protected !!