fbpx

বাউল চুল: সাঈদ কামালের গল্প

আমার লম্বা চুলকে কেন্দ্র করে দুটো দল তৈরী হয়েছে। এক দল পক্ষে অন্যটা বিপক্ষে। পক্ষের সংখ্যা সীমিত বিপক্ষে অধিক। উভয় দলই আমার প্রতি আন্তরিক। তারা কেউ গরম বা এলোমেলো বা অসুন্দরের কারণে চুলকে না করেন। পক্ষের সংখ্যারা সুন্নত কিংবা পাগল পাগল ভাবের কারণে বিনোদনের জন্য চুলকে সমর্থন করেন। দু’দলকে নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ আমাকে বিপন্ন হতে হয়। বিপক্ষ দল মাঝে মধ্যে এমন প্রশ্ন উপস্থাপন করে আমি ভড়কে যাই। চুল রাখছেন কেন, কোন পীরের শিষ্য, কোন দলে যোগ দিছেন, বাউল হলেন কেন, গাঞ্জা টানবেন নাকি এইসব প্রশ্ন আমাকে বিভ্রান্ত করে। তাদের দৃষ্টি এইরকম যে, সুদ নেওয়া, ঘুষ নেওয়া, প্রাণ নেওয়া, মান নেওয়া, অবৈধভাবে অর্থ নেওয়ার চেয়ে চুল লম্বা রাখা অধিক অন্যায়। আমি এদেরকে কিছু বলি না। বলতে ইচ্ছে করে না। সেরূপ চুল সমর্থনকারীরাও আমাকে বিপদগ্রস্থ করে। তারা বলে যে,-‘আপনাকে আমাদের পীর বানাব। আপনি মানুষ হিসেবে এক নম্বর। কেউরে কথা দিলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে হলেও তা পূর্ণ করেন। মিথ্যা বলেন না। কারো এক টাকা খান না। লোভাতুর দৃষ্টিতে নারী দেখেন না। নামাজ টামাজ তো সব সময় পড়েন। আপনাকে দিয়ে হবে। আপনি হবেন আমাদের পীর। আমরা শিষ্য।’আমি যখন তাদের জিগ্যেষ করি যে,-‘পীর হয়ে আমি করব কী? ’জবাবে তারা বলে,-‘আপনি শুধু বসে বসে লম্বা চুল নাড়াবেন, মাঝেমধ্যে পানি পড়ে দিবেন। এই একটু আধটু ফুঁ টুঁ দিবেন। বাকি সব কাজ আমাদের। রোগী ধরা, ওষুধ দেওয়া, সমস্যার সমাধান আমরাই করব। অবশ্য মাঝে মধ্যে আপনি চমকে দেওয়ার মত অলৌকিক কিছু বলবেন। তার ফ্যামিলির তথ্য, সমস্যার কথা বলে বিমূঢ় করে দিবেন। সে তথ্য অগ্রিম আপনাকে জানিয়ে দেব। আপনি শুধু ভাব নিয়া হাত নাড়ায়া কখনো চুল নাড়ায়া বলে দিবেন।’

আমি এদের দিকে তাকিয়ে হাসি। পীরের মত ভাব নিয়া বলি,-‘তাহলে ট্যাকা পয়সার সমস্যা হবে না। দোকানদারি না হয় ছেড়েই দেব। মানুষের সেবা করে ঝুমঝুম টাকা কামাব।’

ওরা আমার কথা শুনে হাসে। সিগারেট ধরায়। গলায় ভাব নিয়ে মৃদু গলায় বলে,-‘আমরা একজন ডিজিটাল বাবাকে পাচ্ছি।’

এসব কথাও আমার মনকে মেঘলা আকাশের মত বিষাদগ্রস্থ করে। ভাবি যে লম্বা চুল রাখাও এক শ্রেণির ভন্ডামি। লম্বা চুলকে আশ্রয় করে বাবা নাম রেখে একটা গোত্র ছাড়পোকার মত রক্ত না খেয়ে বিশ্বাস খেয়ে অশ্লীল ব্যবসা করে। সে অপরাধ যেন আমারই। লম্বা চুল রাখাই একমাত্র সে অপরাধ। তবুও বন্ধুদের মধ্যে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে চুল রাখছেন কেন? জবাবে বলি,-‘ বিখ্যাত হতে, পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকতে।’সেটা কীরকম ভাবে?- তারা পাল্টা পশ্ন করলে বলি,-‘এই যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মধুসূদন দত্ত অমর হয়ে আছেন লম্বা চুল রাখার কারণে। আমিও তো তাদের দলে। দ্যাখবা একদিন আমিও তাদের মত অমর হয়ে থাকব।’

ওরা আমার কথা শুনে হো হো হাসে।

 

কিন্তু একদিন বিপত্তি ঘটে গেল। রাত্রিবেলায় ফাতেহা ফোন দিয়ে জানাল আধঘণ্টার মধ্যে তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। তখন রাত সাড়ে এগারটা। জিজ্ঞেস করলাম,-‘এত রাতে কেন, ফোনে বলা যায় না?’ সে একরোখামি গলায় বলল,-‘দেরি করো না। যা বলেছি তা করো।’

ফাতেহা এমনি। একটু বেশি আহ্লাদী। বাবার একমাত্র সন্তান হলে যা হয়। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় তিন বছরের। প্রথম যেদিন দেখা হয় সেদিন আকাশে অনেক মেঘ ছিল। আমি দোকানে বসে ঝিমুচ্ছিলাম। দোকান আমার বন্ধু আতিকের। আমি মাঝেমধ্যে এসে বসি। সেদিনও বসেছিলাম।

সে ডাকল,-‘এই যে।’

আমি মাথা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার প্রশংসা করলাম এবং বললাম আলহামদুলিল্লাহ। তিনি কত বড় বিজ্ঞানী যিনি নারীর মধ্যে এত এত মায়া ঢেলে দিলেন। ফাতেহা বলল-‘আমি একটা জিপি সিম কিনব। দাম কত?’ বললাম ওর চোখে তাকিয়ে,-‘ দাম নিয়ে ভাববেন না, আপনি বসুন।’

ফাতেহা বসল। তার বসার ভঙ্গি অতি সুন্দর। নারিকেলের পাতা যেমন অল্প হাওয়াতে শান্তভাবে হেলে তার বসার ভঙ্গি এমন। জিজ্ঞেস করলাম-‘ছবি তুলতে আপত্তি আছে?’ ফাতেহা ইতস্তত বোধ করে। খানিক সময় দেয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে থেকে মোলায়েম গলায় বলে,-‘অনেক বেশি আপত্তি তাতে। ছবি ছাড়া সিম দিতে পারবেন?’

ফ্যানের লঘু বাতাসে ওর চুল উড়ে। যেন একটা হলুদ পাহাড়ের বুকে কালো রঙের কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছে। দূর থেকে দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয় কাছে থেকে দেখলে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়। আমি যেন বহুদূর থেকে ফাতিহার চুল দেখছি আর একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। ফাতেহা আমার নীরবতায় বিদ্রোহ প্রকাশ করে বলে -‘যদি না হয় বলে দেন আর বসে থাকতে পারব না।’আমি স্থির গলায় বলি-‘আপনার পরিবর্তে অন্যকেউ ছবি তুললে হবে। সিম তার নামে হবে। এই আর কি!’

ফাতেহা বলল-‘তবে আপনার নামে তুলে দেন না।’

আমি অবাক হয়ে বলি-‘আপনার ফ্যামিলির কেউ হলে ভালো হত।’ফাতেহা কপাল হতে চুল সরায়। কোমল গলায় বলে-‘আমি খুব লুকিয়ে একটা ফোন কিনেছি। এখন আরোও লুকিয়ে একটা সিম নিতে চাচ্ছি। আপনি দেখছি সেটা প্রকাশ করে দিতে বাধ্য করছেন। ভারি ড্যাঞ্জারাস তো আপনে।’

তার সরলতায় আমি মুগ্ধ ও আনন্দিত হই, হেসে ফেলি। বলি-‘আমি আপনার নামও জানি না। তারপর আমার নামে সিম তুলে নিয়ে আপনি কি করেন বা না করেন এরপর বিপদে ডুবে মরব আমি।’

আমার কথা তার কানে অর্ধেক প্রবেশ করা মাত্র সে তড়িৎ উঠে দাঁড়াল। পা দুটো নৃত্যের ছন্দের মত প্রসারিত করল। চার পা অগ্রসর হয়ে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে বাহিরটা দেখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে ঝাঁজ মেশানো গলায় বলল,-‘লাগবে না,আপনার জিনিশ আপনার কাছেই থাকুক।’

আমি তার চোখের কোণে তিল দেখি। তিলটা হলুদ হয়ে গেছে। রাগে যে তিলের রঙ পরিবর্তন হতে পারে এ যে এক বিরল ঘটনা। আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করে। মুখের দু পাশে কদম ফুলের মত ¯বিমুগ্ধ হয়ে গেছে। মানুষের রাগ যে এত সুন্দর হতে পারে এর আগে কখনো মনে হয়নি। রাগলে যে মানুষকে সবচেয়ে অসহায় লাগে এ বাক্যটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেল। রাগলে তাকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে বিষয়টি এমন হয়ত নয়, বলা চলে অন্যরকম সুন্দর লাগে। যে সুন্দরের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে এক গভীর ভালোলাগার জন্ম নিয়ে বুকের খুব গভীরে অন্যরকম শান্তি এনে দিতে পারে।

অনেক দিন মেঘলা ভাব নিয়ে ফিরে যাওয়া আকাশে হঠাৎ মিষ্টি একটা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। হয়ত এর কারণ হতে পারে ফাতেহা। মানুষের মালিক ফেরেশতাকে আদেশ দিলেন যে, মিষ্টি একটা বৃষ্টি দ্যাও। যে বৃষ্টিতে একটা রাগ দেখে কারো হৃদয় হলুদ হয়ে যেতে পারে। সে হলুদ উষ্ণ বরফের মত। যে বরফ সেখানটিতে একটা স্বপ্নের রেখা এঁকে দিয়ে জীবনকে মধুর করে দিতে পারে। আমার কাছে মনে হয় যে জীবনের বেদনাগুলো দূরতম গ্রহের দিকে দ্রুত উড়ে যাচ্ছে। হাসিরা তাদের বিশাল ডাল মেলে দিয়েছে আমার চারপাশে। আমি বসে আছি নতুন এক আনন্দের গ্রহে। সে গ্রহে আমি আর ফাতেহা।

ফাতেহা বসল। তার বসার ভঙ্গির প্রশংসা করতে হয়। এটা যেন স্বরবৃত্ত ছন্দের মত। বোধয় এমন দৃশ্য দেখে কাব্য জগতে প্রথমে স্বরবৃত্ত ছন্দের জন্ম হয়েছিল। আমি বলি-‘আপনার রাগ ভারি মিষ্টি।’ফাতেহা এক পলক আমাকে দেখে উদাস গলায় বলল-‘আপনারা ছেলেরা যে আসলে কি ভয়াবহ ড্যাঞ্জারাস, চেনা খুব মুশকিল।’আমি হেসে হেসে বলি-‘মেয়েরাও কখনো কখনো ড্যাঞ্জারাস হয়।’ফাতেহা চোখ ঘুরিয়ে বলল-‘ইশ,বললেই হল।’

আমি বাইরে তাকাই। বৃষ্টি দেখি। ঘরের সামনে অনেক জল জমে গেছে। সে জলে একটা হাঁস সাঁতার কাটছে আর প্যাঁক প্যাঁক করছে। হয়ত সে তার সঙ্গীনিকে ডাকছে। ওদিকে তাকিয়ে বললাম-‘আমি আপনাকে সিম দিচ্ছি। আমার জাতীয় পরিচয়পত্রই তাতে ব্যবহার করব।’

ফাতেহা কথা বলল না। আড় দৃষ্টিতে আমাকে দেখল। সিম নিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে আমার ছাতাও নিয়ে গেল এবং বলল‘লম্বা চুলে আপনাকে চমৎকার লাগে।’

সে সময় আমার চুল খুব একটা লম্বা হয়নি। প্রথম পর্যায় অতিক্রম করে ঝিম মেরে ছিল। আমি ওর দিকে ফিরে হেসে বললাম-‘যাক একজনের ভালো লাগার কারণে চুলকে না হয় স্থায়ী করে ফেলব।’ফাতেহা ছাতা মেলে বলল-‘চমৎকার বলেছি। ভালো লেগেছে তো বলিনি।’

সেদিন থেকেই শুরু। দশ মাস আমরা আমাদের বুঝতে সময় নিলাম। এবং একদিন বুঝতে পারলাম উভয়ে উভয়ের জন্য। বৃক্ষের জন্য যেমন পাতা, দিনের জন্য যেমন আলো, অসুখের জন্য যেমন ওষুধ তেমনি আমার জন্য ফাতেহা এবং ফাতেহার জন্য আমি।

সে রাতে ফাতেহার ফোন পেয়ে আমি আর বিলম্ব করিনি। হয়ত ওর বড় রকমের বিপদ হয়েছে, এই রকম ভেবে দ্রুত হাঁটতে শুরু করি। আকাশে চমৎকার চাঁদ। কয়েকটা তারা তাকে পাহাড়া দিচ্ছে। আমি হাঁটছি। রাস্তায় কেউ নাই। তিনটি কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজনের মুখে শুকনো রুটি। ব্রিজ পাড় হয়ে কলেজের রাস্তার কাছাকাছি চলে এসেছি। আর চারটে বাড়ির পরেই ফাতেহাদের বাড়ি। বড় বৃষ্টি গাছের নিকট যখন এলাম তখন দেখতে পেলাম দুজন লোক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। এই বৃষ্টি গাছটি আমার চেয়েও অনেক বড়। আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখনই তাকে বড় দেখেছি। লোক দুটো আমার দিকে এগিয়ে এল। আমার হাত ধরে বলল-‘বাবা,ধন্য আমরা। আপনার সাক্ষাত পেয়েছি। এই নেন, ঢেলে খান।’

ওদের একজন আমাকে একটি বোতল দিতে উৎসুক হল। ওরা কে বা কারা বুঝতে পারছিলাম না। ওদের কি বলব ভাবতে পারছিলাম না। আমি চুপ করে থাকি। ওদের একজন আবার বলল,-‘বাবা,আপনাকে ভালোবেসে নয় মাস ধরে চুল রাখছি; এই দেখুন আমার লম্বা চুল।’ওরা দুজন তাদের লম্বা চুল আমাকে দেখাল। আমি বুঝতে পারছিলাম না ওরা কারা। কখনো মনে হচ্ছিল কোন বন্ধু হয়ত মজা করতে এই ফাঁদ পেতেছে কখনো মনে হচ্ছিল ওরা হয়ত ভুল করে ভুল মানুষকে বাবা ডাকছে। জিজ্ঞেস করলাম-‘তোমরা কারা?’ বোতলটা ব্যাগে ভরে একজন বলল,-আমার নাম আজিজুল। অন্যজন বলল-‘আমার নাম কাশেম।’

আমি ওদের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে বললাম-‘আমি বাবা না, ভাই। তোমরা ভুল করছ।’

আজিজুল তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করে-‘তবে চুল লম্বা যে।’

আমি বলি-‘ভাই ,দুনিয়াতে কি চুল রাখার স্বাধীনতা নাই? এটা আমার শখ, ভালোলাগা।’

কাশেম মাথা নেড়ে বলল-‘আপনি আমাদের বোকা বানায়েন না। এত তপস্যা করে আপনাকে পেয়েছি সহজে ছাড়ছি না।’

-‘কই নিবা?’

‘মাজারে লইয়া যায়াম।’আজিজুল জবাব দেয়।

-‘কোন মাজারে? আমি মাজারে যাব কেন?’

আজিজুল আবার বলে-‘বাবা, আপনি আমাদের সঙ্গে রাইগা আছেন এহনো। আপনার পায়ে ধরি রাইগা থাইকেন না আর।’

বিপদে যে ডুবে গেছি বুঝতে পারছি কিন্তু উদ্ধারের কোন পদ্ধতি মাথায় আসছে না। বলি -‘রাগ করব কেন?’

কাশেম আমার হাত ধরে। তার শরীর থেকে বিশ্রী একটা গন্ধ আসে। সে বলল-‘আপনার চুলের কত গুণের কথা শুনেছি। আপনার চুল ধোয়া পানি পান করে কত রোগী আরোগ্য লাভ করেছে। কত মানুষ বিপদ মুক্ত হয়েছে। ধনবান হয়েছে অনেক মানুষ। ছাত্ররা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ভাঙা সর্ম্পক জোড়া লেগেছে কত শত।’

আমি অবাক হয়ে বলি-‘সত্যি নাকি?’

কাশেম বলল,-‘বাবা,আপনার চুল আবার আপনিই জিজ্ঞেস করছেন। মজা করছেন নিশ্চয়?’

আমি একটু রাগের ভাব নিয়ে বলি-‘মজা তো আপনারা করছেন। মধ্য রাতে আমাকে একা পেয়ে বাবার দোহাই দিয়ে আটকে রেখে আমোদ নিচ্ছেন।’

আজিজুল বলল-‘গত আট মাস তের দিন যাবৎ আপনার খবর নাই। কত কোথাও আপনার সন্ধান করেছি যে হিসেব নেই। অবশেষে পাইলাম, এখন আপনি ভাঁওতামি করে ছাড় নেওয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ করে জানাচ্ছি লাভ হবে না তাতে। আপনাকে ধরে হলেও নিয়ে যাব।’

কাশেম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। গলার আওয়াজ উঁচু করে বলে-‘বাবাকে পেয়ে হারানোর চেয়ে ধরে নিয়ে বেআদবি করা এরচেয়ে বরং ভালো।’

আমার ভয় হয় এদের কান্ড দেখে। এদের থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করি মনে মনে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হবে বুঝতে পারছিলাম না। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ‘একটু আসছি,তোমরা বসো’এমন কিছু বলে ওদের মানানো যে যাবে না বেশ বুঝতে পারছি। সে সময় আমার ফোনে রিং হয়। ফাতেহার ফোন। ফাতেহা সেই ঝাঁজ মেশানো গলায় বলল-‘তোমাকে সেই কখন আসতে বললাম, এখন কই তুমি? দেরি কেন এত বেশি? ’আমি শান্ত গলায় বললাম- ‘দুটা লোক বাবা বলে ডেকে আমার পথ আটকে রেখেছে। ওরা বলছে আমি নাকি চুল বাবা…! আমার কথা শেষ হওয়ার পূর্বে ফাতেহা বলল-‘কি সব মাতালের মত বলছ, মদ খাইছ নাকি?’

ফাতেহা এমনি। যখন যেটা চায় তখনই সেটা পাওয়া চায়। ব্যতিক্রম হলে ও কি বলে না বলে বুঝতে পারে না। বললাম-‘বিশ্বাস না হলে দেখে যাও, বৃষ্টি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি।’ফাতেহা ফোন কেটে দিলে আমি আজিজুল ও কাশেমের দিকে তাকিয়ে বললাম-‘কী ভায়েরা ,বুঝতে তো পারছ এবার ।’কাশেম মাথা চুলকে বলল ,-‘সত্যি আপনি আমাদের চুল বাবা ,না?’

‘আমি তো প্রথম থেকেই বলছি। আমি বাবা দাবা কিছু না। আপনারা তো বিশ্বাস করছেন না।’-বললাম আমি।

আজিজুল মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় মাটিতে পড়ে থাকা পাতা দেখে।

কাশেম দু’পা এগিয়ে আমার সামনে দাঁড়ায়।-‘আপনি নিশ্চয় খলিফা ওমরের সময়ের সেই ঘটনা জানেন। ওই যে এক মহিলা উনুনে হাঁড়ি বসিয়ে জল গরম করে খাবারের কথা বলে বাচ্চাদের ফাঁকি দিচ্ছিল; আপনি কি আমাদের এমনি ফাঁকি দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন?’

কাশেমের বুদ্ধিদীপ্ত কথা আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় না যে ওরা অজ্ঞ। গভীর অন্ধকারের জগৎ থেকে বের হওয়ার  বোধ ওদের আছে। ওরা  পুষ্পের সুগন্ধী নিয়ে সফেদ পায়রাদের উড়ে যাওয়া দেখে দেখে এক আলোকিত ভালোবাসার সন্ধান পেতে পারে। অথচ ওরা ছুটে চলছে অমাবস্যার পিছনে। যে ভালোবাসা ওদের  উজ্জীবিত করবে ওরা সেদিকে না তাকিয়ে ছুটে অসীম শূন্যতার দিকে। যার চারদিকে ক্ষুধিত পশুদের বসতি। ওরা আলিঙ্গন করতে উন্মাদ সে সব ছদ্মবেশী জীবদের। বেদনা হয় ওদের কথা ভেবে। শান্ত গলায় বলি-‘নিজেকে যে ফাঁকি দেয় অন্যরা তাকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করতে পারে না। তোমরা তো নিজেকে ফাঁকি দিচ্ছ।’

সে মুহূর্তে ফাতেহা আসে। তার হাতে ছোট র্টচ। সে সরাসরি আমার চোখে আলো ফেলে বলল-‘কি ব্যাপার, মধ্যরাতে জ্ঞান বিতরণ হচ্ছে, না?’

-‘মধ্যরাতে রাস্তায় খাড়ায়া জ্ঞান দিতে যে কারো কারো ভালো লাগে না, তুমি বুঝতে পারো, ফাতেহা?’

-‘তো হয়েছে কী শুনি।’

আজিজুলের গলায় ঈষৎ মেঘের ফাঁকে অর্ধেক ডুবে যাওয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,-‘সে¦সুরেশ্বরী মাজারে চুল বাবা থাকতেন। তিনি অনেক কামেল ছিলেন। তার চুল ধোয়া পানি অনেক রকম সমাধানের ওষুধ হয়ে কাজ করত। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে বাবার খবর নেই। আজকের রাতে উনার লম্বা চুল দেখে ভাবছিলাম পেয়েছি আমাদের চুল বাবাকে।’

ফাতেহা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। টর্চের আলো মাটিতে ফেলে আস্তে আস্তে বলে-‘আপনাদের দেখি কোন খবর নাই। টিভি না হয় দেখেন না, পত্রিকা না হয় পড়েন না কিন্তু ফেইসবুকে ভাইরাল হলো যে এও জানেন না? সুরেশ্বরী মাজারের চুল বাবা যে গত আট মাস ধরে পুলিশের হাতের ভাত খাইতেছে তাও জানে না?’

ফাতেহা এবার আমার দিকে তাকাল-‘তোমাকে কত দিন বললাম চুল ছোট করো। লম্বা চুলে তোমাকে বিশ্রী লাগে। তুমি বাউল হইবা, লম্বা চুল নাড়ায়া নাড়ায়া হাঁটবা, বিখ্যাত হইবা, অমর হইবা, হও এবার। আপনেরা ওরে ধইরা নেন, ওই আপনাদের চুল বাবা।’

আজিজুল ও কাশেম এবার বুঝতে পারে সত্যটা। কাশেম বলে-‘দোষ আমাদেরই। বুঝতে পারিনি। আমরা আসলে চোখে দেখেও ডুবে যাচ্ছিলাম। ক্ষমা করবেন।’

ওরে সঙ্গে আজিজুলও বলল-‘আমরা আসলে এত বেশি চুল বাবার ডাক্তারির কথা শুনেছি যে ভুলেই গিয়েছিলাম লম্বা চুলের সবাই চুল বাবা না। লম্বা চুলের কেউ কেউ সুন্দর মানুষ। যা করেছি তার জন্য দুঃখিত।’

ফাতেহা বলল-‘আপনারা যান এখন। নইলে ওকে চুল বাবার সঙ্গে জেলখানায় পাঠিয়ে দেব।’

ওরা আর বাক্য খরচা না করে দ্রুত প্রস্থান করে। ফাতেহা বলল-‘শিক্ষা না যদি হয়ে থাকে তবে আরোও লম্বা করে বাউল সাজো। তারপর পাগলের ভাব নিয়ে পথে মাঠে ঘুরে বেড়াও।’

আমি বললাম- ‘তোমার জন্যই তো ঘটল এই ঘটনা। কী জন্য ডেকেছিলে শুনি?’

ফাতেহা বলল-‘যে জন্য ডেকেছিলাম সেটা আর বলব না। তবে নতুন করে যদি বলি তবে বলব কাল দিন পর তোমাকে যেন বাউল চুলে না দ্যাখি।’

 

আমি চুল কাটাইনি। ইচ্ছে করেনি। চুলের মায়ায় আবদ্ধ হয়েগিয়েছিলাম। সপ্তাহ পরে ফোনে ফাতেহা জানতে চেয়েছিল চুল কেটেছি নাকি, কাটাব নাকি। আমি বলেছিলাম যে, আমার ভালো লাগে বাউলের মত লম্বা চুল আন্দোলিত করে নিরুদ্দেশে হেঁটে যেতে। ফাতেহা বলেছিল, বেশ তো। তাই করো। বাউল হও। বড় বাউল।

এরপর দীর্ঘদিন কেটে গেল, ফাতেহার চোখে এক পলক আর তাকানো হলো না। জানানো হলো না ফাতেহার মত চুলও আমার থেকে  অর্ধেক প্রস্থান করেছে। ভালোবাসার মানুষের প্রার্থনার চেয়ে অভিশাপ যে বেশি প্রভাব ফেলে বলা হলো না একদিনও।

 

আরো পড়ুন: করোনা কালের গল্প

আমাদের ফেসবুক পেজ: সুধাপাঠ

 

error: Content is protected !!