fbpx

সভ্যতার রূপ: শাহিন চাষীর করোনা কালের গল্প

মুখের হাসি দিয়ে সুখ মেপো না, হোঁচট খাবে- অনেকটা তাচ্ছিল্যের হাসিতে, খানিকটা রূঢ় হয়ে কথাগুলো বলে ফেলল পল্লবী।

পল্লবী। পুরো নাম পল্লবী সেন। লক্ষণ সেন বা বল্লাল সেন কারো বংশধারার কেউ কিনা জানি না। তবে শুধু পোশাকটা বাদ দিলে আর সব কাজে-আচরণে বেশ বোঝা যায়- তার শরীরে বহমান রক্ত কোনো সাধারণ রক্ত নয়, সে রক্তে ছড়িয়ে আছে প্রত্যয়ের আগুন আর শুদ্ধতার নির্যাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকেই পল্লবীকে চোখে পড়ে। শ্যামলা রঙের মেয়ে। কিন্তু কী যে তাকে সবার থেকে আলাদা করেছে ঠিক বুঝে উঠিনি কোনোদিন। মনে আছে, প্রথম দেখাতেই তার চলনভঙ্গি মনে কাঁপন লাগিয়েছিল–ভালোলাগার কাঁপন, ভালোবাসার কাঁপন। কেউ হাসছেন? প্লিজ, হাসবেন না। ভালোবাসার মতো ভালোলাগাও কোনো ব্যাকরণ মানে না।

আমরা একসাথেই পড়তাম। সাধারণ ঘরের মেয়ে হলেও মেধা-মননে ছিল অসাধারণ! ওকে প্রথম দেখার পর থেকে আর চাঁদ দেখতে ইচ্ছে করেনি আমার। মনের অভিব্যক্তি জানানোর জন্য, বুকের ভেতরে বইতে থাকা ঝড়ের গর্জনটা শোনানোর জন্য, সেই প্রথম দিন থেকেই খুব ব্যাকুল হয়ে ছিলাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে পল্লবীই শেষ কথা। আজও অপেক্ষায় আছি- পল্লবী আসবে, যদিও আসবে না কোনোদিন!

দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। ঠিক করে ফেললাম- আর না, এবার হৃদয়ের কথাগুলো বলেই ফেলব ওকে। কিন্তু সময় দাঁড়িয়ে গেল প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে। প্রতিকূল সময়ে আগুনের মাঝে হাঁটা কিংবা বিপরীত স্রোতে সাঁতার কাটার মতোই সুখকর জীবন।

পহেলা এপ্রিল পল্লবীকে সব বলব বলে ঠিক করেছিলাম। তারপর কত পহেলা এপ্রিল এলো-গেলো, কপোতাক্ষ-সুরমায় গড়িয়ে গেল কত জল, শুধু জমানো কথাগুলো জানানো হল না। সে-কথাগুলো আজও দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে ঝরে পড়ে, কেঁপে-কেঁপে ওঠে আমার একার ঘরে!

একদিন কোভিড-১৯ বাঘ থেকে বিড়াল হয়ে এলো। ক্ষত-বিক্ষত পৃথিবী বিপুল বোঝা নিয়েও আবার স্বাভাবিক হতে থাকল। আবার আমাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠল প্রিয় ক্যাম্পাস, সেমিনার, শ্রেণিকক্ষ। প্রিয়-অপ্রিয়, চেনা-অচেনা মুখগুলো সব চোখের সামনে। শুধু আমার আরাধনার সেই মুখটা দেখি না কোথাও! বুকের মধ্যে তখন তুষার ঝড়!

যে-মেয়েটি কোনোদিন ক্লাস মিস করেনি, সে ক্যাম্পাসে নেই! শঙ্কিত হয়ে উঠলাম। তবুও লম্বা ছুটির পর প্রথম দিন ভেবে খুব বেশি আমলে নিলাম না। বড়ো বড়ো ছুটির পর প্রথম দিনের ক্লাসে উপস্থিত না থাকা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা একসাথে করলে পৃথিবী বিস্মিত হতে পারে- এরাই শেষপর্যন্ত কালের মাঝি হয়! এ ক’দিন আগে আমিও সে দলেই ছিলাম।

গুনে গুনে সাত দিন কেটে গেল। পল্লবীর খোঁজ নেই। রুমানার কাছেও ওর খোঁজ পেলাম না। ফোন বন্ধ। সম্ভাব্য সব সমস্যা মাথা থেকে উড়ে যেতে লাগল। এখন কেবলই শঙ্কা। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরে বাবার আদরের মেয়েটা কী করোনার শিকার হলো? পত্রিকায় দেখা কালো কালো সংবাদের উপসর্গ হলো? নাহ্! তেমন হলে এতদিনে কোনো-না-কোনোভাবে একটা সংবাদ তো পাওয়া যেত। কিন্তু এও তো সত্য, পৃথিবী আর সময় সবার সংবাদ রাখে না।

সেদিন শুক্রবার। নিজেকে ধরে রাখার শক্তি ও সামর্থ্য কোনটাই আমার ছিল না। ওকে না দেখে সময় কাটানো নিজ-কাঁধে নিজের লাশ বহনের মতো।

সন্ধ্যার কিছু আগে ওদের বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরোজার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তালা লাগানো দরোজা অনেকবার দেখেছি। কিন্তু এমন তালা কোনোদিন দেখিনি। আমি জানি, মন অস্থির হলে ভাবনা উদ্ভট হয়। আবার আমার এও মনে হয়, শঙ্কিত মনের ভাবনা খুব বেশি ভুল হয় না।

হঠাৎ মনে পড়ল, এ বাসারই আরেক ফ্ল্যাটের একটা মেয়েকে পড়াত পল্লবী। সেখানে গেলাম। শান্ত স্বভাবের চল্লিশ ছুঁইছুঁই একজন মহিলা দরোজা খুললেন,

-কাকে চান?

-আমি পল্লবীর ক্লাসমেট। ওদের দরোজা বন্ধ। তাই মানে আরকি…

-ওওও, আচ্ছা। ওরা তো সব ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। আর আসবে না। তুমি নিশ্চয় বিধান?

-জি।

-ভেতরে এসো।

আমি ওর সম্পর্কে জানতে পারব ভেবে কোনো আপত্তি না করেই ভেতরে গেলাম। আমার সামনে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ভারি ভালো ছিল মেয়েটা। আমার মেয়েকে পড়াত। বয়সের ডিস্টেন্স থাকলেও ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আমাদের দু’জনের। অনেক কথা শেয়ার করত পল্লবী।

‘ওরা চলে গেল কেন?’ জিজ্ঞেস করতেই লম্বা করে শ্বাস ফেললেন তিনি। তাঁর চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রুকণা। ঠিকানা নিয়ে পল্লবীদের গ্রামের বাড়ি গেলাম। কাকিকে দেখামাত্র লুকোনো ব্যাথাটা দপ করে জ্বলে উঠল। এ ক’দিনে কী রোগাটেই না হয়ে গেছেন তিনি! চোখ দুটো ঘিরে কেমন এক উৎকণ্ঠা, ভয়, ঘৃণা। আমাকে দেখে নিজেকে শান্ত রাখলেন। বুঝলাম, পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে সবারই অভিনয় জানা থাকতে হয়। অনেকটা ঘোরের মধ্যে জিজ্ঞেস করে ফেললাম, কী হয়েছিল, কাকিমা?

চোখ দুটো যথাসম্ভব শান্ত রেখে বললেন–‘করোনা আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে, বাবা!… তোমার কাকার চাকরিটা চলে গেল, বিদ্যুৎ-বিল, বাড়ি ভাড়া সব বাকি পড়তে থাকল। একদিন আমাদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে বসল বিত্তবান বাড়িওয়ালা।…’ একগাল হেসে বললেন, ‘আমি মরতে পারলাম না! কিন্তু ছোট মেয়েটা আর ওর বাবা ঠিকই…!’

এখনো চলতে-ফিরতে যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো হাসিমুখ, তখন কেন জানি সব অভিনয় মনে হয়। মনে হয়, পল্লবী বলছে, ‘মুখের হাসি দিয়ে সুখ মেপো না, বিধান, হোঁচট খাবে।’

আরো পড়ুন: গল্প লেখার কৌশল

আমাদের ফেসবুক: সুধাপাঠ সাহিত্য পত্রিকা

error: Content is protected !!